lecture10.2

সমস্ত রকম ওপেনিং নিয়ে হালকা ধারণা হবার পর এবার আমরা কয়েকটা ওপেনিং নিয়ে একটু গভীরে আলোচনা করবো। আমাদের আলোচনার প্রথম ওপেনিং এর নাম স্প্যানিশ ওপেনিং বা রুই লোপেজ ওপেনিং। স্প্যানিশ ওপেনিং একটা বহুদিনের পুরনো ওপেনিং যা আজও বহুল প্রচলিত। স্প্যানিশ ওপেনিং আমাদের আগের লেকচারের ওপেনিং এর রকমভেদ অনুযায়ী ওপেং গেম সেকশনে পড়ে। স্প্যানিশ অপেনিং শুরু হয় নিচের চালগুলো দিয়ে

1.e4 e5

[মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন।]

2.Nf3

[e5 বোড়েকে আক্রমণ]

2…Nc6

[রক্ষণ]

3.Bb5

এই চালটা স্প্যানিশ ওপেনিং এর সনাক্তকরন চাল। এই অবধি খেলা হলেই তবে সেই খেলা কে স্প্যানিশ ওপেনিং বলে।

[শেষ চালে সাদা e5 এর রক্ষক ঘোড়া কে খেয়ে নিয়ে কালোর কেন্দ্রের দখল দুর্বল করতে চাইছে।]

3…a6

[গজের উপর প্রতি আক্রমণ।]

4.Ba4

[ বিকল্প চাল 4.Bxc6 dxc6 5.Nxe5 খেলে কালোর e5 বোড়ে জিতে নেওয়া যায় না কারন এরপর কালো  5…Qd4 6.Nf3 Qxe4+. খেলে সাদার e4 বোড়ে জিতে নিতে পারে।]

4…Nf6

[ e4 বোড়ের উপর আক্রমণ]

5.0-0 Be7

[বিকল্প চাল 5…Nxe4 খেলে একটা বোড়ে জিতে নেওয়া যায় না কারন এরপর সাদা 6.Re1 Nf6 7.Rxe5+ খেলে কালোর e5 বোড়ে জিতে নিতে পারবে। 5…Be7 এর পর কালো কাসল করার জন্য তৈরী হয়েছে ]

6.Re1

[e4 বোড়ের রক্ষণ। এবার সাদা 7.Bxc6 dxe6 8.Nxe5 এর দ্বারা একটা বোড়ে জিতে নেওয়ার আসল সম্ভাবনা তৈরী করেছে]

6…b5

[e5 বোড়ের রক্ষণ]

7. Bb3

[সাদা d4 খেলে কেন্দ্রের দখল নিতে চায়। কালো d4 এর বোড়ে খেয়ে নিলে সাদা c-ঘরের বোড়ে দিয়ে খেয়ে আদর্শ কেন্দ্র বানাতে চায়।]

7…d6

[e5 বোড়ের অতিরিক্ত রক্ষণ]

8.c3

[ d4 এর প্রস্তুতি এবং b3 গজ এর জন্য একটা অতিরিক্ত ঘর c2 তৈরী করা 8.Na5 Bc2 এবং কালো ঘোড়া সাদার গজ খেতে পারবে না]

8…0-0

[9..d4 Bg4,  এবং সাদার কেন্দ্র রক্ষা করা কঠিন, কারন এর পর কালো f3 ঘরের ঘোড়া খেয়ে নেওয়ার মাধ্যমে d4 এর রক্ষণ দুর্বল করে দিতে পারে]

9. h3

[এই চালটি সময় নষ্ট নয়, কারন d4 খেলার জন্য এই প্রস্তুতি জরুরি।  সুতরাং পরের চালে সাদা d4 খেলতে পারবে]

এর পরের পজিশন টা স্পানিশ ওপেনিং এর জন্য খুব পরিচিত। আসল খেলা এখান থেকে শুরু হয়। কিন্তু এই অবস্থানে পৌছতে গেলে প্রত্যেকটা চাল পরিকল্পনা মাফিক দেওয়া দরকার।

অবশ্য প্রত্যেকটা চাল একদম উপরের মতো খেলতে হবে এমন নয়। সাদা বা কালো দুজনের ই বিকল্প চাল দেওয়ার সুযোগ আছে। তবে যে চালগুলো এখানে দেখিয়েছি সেগুলো খুব ভালো চাল। এখনকার গ্রান্ডমাস্টার দের খেলায় এই চালগুলো খুব সচরাচর দেখা যায়।

এই পজিশনে সাদার কেন্দ্রের দখল খুব ভালো। কালো সাধারণত এই দখল দুর্বল করার জন্য কেন্দ্রে আঘাত করার চেষ্টা করে, সাদা দখল বজায় রাখার চেষ্টা করে। কেন্দ্রে আঘাত করার জন্য কালোর সফলভাবে d6-d5 খেলা দরকার। d5 এখনই সম্ভব নয়, প্রস্তুতি দরকার। কালো d5 খেলতে অসমর্থ হলে সাদার সাধারণত ভালো পজিশন থাকে, আর কালো সফলভাবে d5 খেলতে পারলে কালোর পজিশন খুব ভালো হয়ে যায়। এই ধরনের ওপেনিং এ, এবং বেশিরভাগ কিংস পন ওপেনিং এ d5 সফলভাবে খেলতে পারা বা না পারার উপর খেলা কোনদিকে গড়াবে তা নির্ভর করে। তাই d5 চাল কে break move বা liberating move বলা হয়।

ব্রেক মুভ বা লিবারেটিং মুভ সম্বন্ধে ভালো ধারণার জন্য একটা বা দুটো পুরো খেলা দেখা দরকার। পরে কখনও দেখাবো।

Advertisements

chess101-lecture10.1

আমরা এতদিনে নিশ্চিতভাবে খেলার প্রারম্ভিক ভাগের সাধারন নিয়ম ও লক্ষ্য সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা তৈরী করেছি। এই লেকচার পড়ার আগে আগের লেকচার টি পড়তেই হবে, নয়তো বুঝতে অসুবিধা হবে। এই লেকচারে আমরা খেলার শুরুতে 1.a4/1.h3 ইত্যাদি চাল গুলো কেন খারাপ তা নিয়ে আলোচনা করবো না। আমি ধরে নেবো পাঠকরা ইতিমধ্যে এই চালগুলো কেন খারাপ তা শিখেছেন।

এবার আমরা একদম সরাসরি টপিকে ঢুকে পড়বো। সমস্ত নিয়ম এর কথা মাথায় রাখলে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত চাল কি হতে পারে তা আন্দাজ করা যায়। যুক্তিযুক্ত চালগুলো জনপ্রিয় চাল। পুরনো খেলার ডাটাবেস দেখলে কোন একটা পজিশনে সবচেয়ে জনপ্রিয় চাল কি তা আমরা খুব সহজেই দেখতে পারি।

একদম খেলার শুরুতে সবচেয়ে জনপ্রিয় চাল দুটো চাল হলো 1.e4 ও 1.d4. অর্থাৎ খেলার একদম শুরুতে সাধারণত রাজার সামনের বোড়ে দু’ঘর বা মন্ত্রীর সামনের বোড়ে দুঘর এগিয়ে খেলা শুরু হয়। 1.e4 কে বলা হয় kings pawn opening এবং 1.e4  কে বলা হয় queens pawn opening. আমরা চাল দুটো নিয়ে এক এক করে কথা বলবো।

কিংস পন ওপেনিং

1. kings pawn opening

– open games

1.e4 e5

-semi open games

1.e4 other

1.e4 নিয়ে প্রথমে কথা বলা যাক। এটা একটা ভালো চাল কারন এতে কেন্দ্রে দখল নেওয়া হয়েছে এবং আরো অনান্য ঘুটি খুব দ্রুতগতিতে বাইরে আনার পথ তৈরী হয়েছে। এর উত্তরে কালোর কাছে অনেক রকমের সম্ভাব্য চাল আছে। তবে প্রত্যেকটা চালের পিছনেই কোনভাবে কেন্দ্রের দখল নিয়ে লড়াই এবং ঘুটির দ্রুত বিকাশের পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক।

উপরের কথা মাথায় রেখে এবার আমরা উদাহরণ দেখবো। কালোর একটা খুব জনপ্রিয় প্রথম চাল হলো 1…e5. এবার একটু নামকরণ শিখে নিই। 1.e4 e5 চালের মাধ্যমে খেলার শুরু হলে সেই ওপেনিং কে বলা হয় ওপেন গেম (open game)।

চালটির উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন নয়, কালো ও সাদার পরিকল্পনা অনুসরণ করে খেলে খেলেছে। কালোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো সাদাকে আদর্শ কেন্দ্র দখল করতে না দেওয়া। আদর্শ কেন্দ্রের উদাহরণ আগের লেকচারে দিয়েছি। আদর্শ কেন্দ্র মানে e4/d4  এই দুই ঘরে বোড়ে রাখা। এক্ষেত্রে কালোর চালের পিছনে যুক্তি হলো, সাদা দ্বিতীয় চালে 1.e4 e5 2.d4 চাল দিলে সাদা 2…exd4 চালের মাধ্যমে বোড়ে টি কে খেয়ে নেবে। এর উত্তরে সাদা 3.Qxd4 খেলতে পারে, কিন্তু তার ফলে কালো সাদার মন্ত্রী একদম শুরুতেই বাইরে চলে এসেছে, এবং কালো পরের চালেই 3…Nc6 চালের মাধ্যমে মন্ত্রী কে আক্রমণ করে একটা ঘুটি বিকাশ করতে পারে। সাদার মন্ত্রী আক্রান্ত হওয়ায় সাদাকে পরের চালে মন্ত্রী আবার চালতে হবে, এবং এর ফলে কালো ঘুটির বিকাশে এগিয়ে যাবে। সুতরাং এরকম ভাবে খেলা সাদার জন্য ভালো নয়।

সেইজন্য 1.e4 e5 এর উত্তরে 2.d4 সবচেয়ে জনপ্রিয় চাল নয়। অন্য চাল, যেমন 2.Nf3/2.Nc3/2.Bc4 ইত্যাদি ভালো চাল এবং বেশ জনপ্রিয়। এর উত্তরে কালো তার ঘুটি দ্রুতগতিতে বাইরে আনবে এবং খেলা চলতে থাকবে।

এরকম ভাবে না খেলে কালো প্রথম চালে অন্য ভাবে কেন্দ্রের জন্য লড়াই করতে পারে। 1.e4 এর উত্তরে 1…e5  এর বদলে অন্য কোন চাল খেলা হলে সেই ধরনের খেলা কে বলা হয় semi open game.

আর একটা খুব জনপ্রিয় চাল হলো 1…c5. এই চালের পিছনে যুক্তি হলো, এক্ষেত্রেও সাদা দ্বিতীয় চালে 2.d4 খেলে আদর্শ কেন্দ্রের দখল নিতে চাইলে কালো 2.cxd4 এর দ্বারা বোড়ে টি খেয়ে নেবে। এতে কালোর একটা প্রান্তের বোড়ের (c file) দ্বারা সাদার একটা কেন্দ্রের বোড়ের বিনিময় হয়েছে, এবং কালোর একটা কেন্দ্রের বোড়ে বেশি আছে। কালোর এই অতিরিক্ত বোড়ে ভবিষ্যতে কেন্দ্রের দখলে কাজে লাগবে। পরবর্তীকালে সাদার একটা কেন্দ্রের বোড়ে দিয়ে কালোর দুটো কেন্দ্রের বোড়ের সাথে লড়াই করতে হবে। সুতরাং কেন্দ্রে কালোর দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা আছে।

1.e4 এর উত্তরে 1…e5 or 1…c5 সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার কারন এই দুটো চালের মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্রের দখলের জন্য লড়াই করা হয়। এছাড়া আরো কিছু জনপ্রিয় চাল আছে যার মাধ্যমে একচাল প্রস্তুতি নেওয়ার পর দ্বিতীয় চালে কেন্দ্রের জন্য সরাসরি লড়াই শুরু হয়। যেমন 1…e6 or 1…c6.  পরের চালে সাদা 2.d4 খেলতে পারে, কারন কেন্দ্রে কালো এখনো অবধি লড়াই করেনি। কিন্তু সাদার দুটো বোড়ে আদর্শ স্থান নেবার সাথে সাথেই কালো কেন্দ্র কে আক্রমণ করবে। সুতরাং দ্বিতীয় চাল হলো 2…d5. এবার বোঝা গেলো, কালোর প্রথম চালটা আসলে দ্বিতীয় চালের প্রস্তুতি ছিলো। এরপর জটিল খেলা চলে, কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, সাদা আদর্শ কেন্দ্র রক্ষা করতে পারবে না। সংক্ষেপে সাদার হাতে তিন রকম সুযোগ আছে।

১/কেন্দ্রের বোড়ে বিনিময় করতে হবে, এর ফলে বিনিময়ের পর সাদা এবং কালো, দুজনের ই কেন্দ্রের উপর সমান দখল থাকবে।

২/ বোড়ে বিনিময় করতে না চাইলে সাদা কে একটা বোড়ে আবার চালতে হবে, এতে সময় নষ্ট হবে। এবং এরপর কালো যত সম্ভব দ্রুতগতিতে সমস্ত ঘুটি বাইরে এনে কেন্দ্রের এগিয়ে যাওয়া বোড়ে কে আক্রমণের চেষ্টা করবে, আর সাদা কেন্দ্র রক্ষার চেষ্টা করবে।

৩/ সাদা কেন্দ্র নিয়ে কিছুই করুবে না, এতে পরবর্তীকালে কালো কেন্দ্রের বোড়ে বিনিময়ের মাধ্যমে সাদার আদর্শ কেন্দ্র ভেঙে দেবার সুযোগ পাবে।

1.e4 এর উত্তরে কালো যদি প্রথম বা দ্বিতীয় চালে কেন্দ্রে জন্য সরাসরি লড়াই না করে তবে সাধারণত চালগুলো খুব একটা ভালো নয়। এই কারনে 1…a6/1…h6/1…b6/1…g6 খুব একটা ভালো চাল নয়। এবং এইসব কারনে চালগুলো খুব একটা খেলা হয়না।

আমরা open game/semi open game  এর রিভিউ এখানেই শেষ করলাম।

কুইন্স পন ওপেনিং

2. queens pawn opening

-closed games

1.d4 d5

-semi closed games

1.d4 other

এরপর আমরা 1.d4 এবং তার পরবর্তী চাল নিয় কথা বলবো। 1.d4 এর উত্তরে 1…d5 খেলা হলে তাকে বলা হয় closed game. এরপর সাদার পক্ষে দ্বিতীয় চালে 2.e4 খেলা সম্ভব নয়, কারন e4 ঘরের কোন রক্ষণ নেই। সাদা সাধারণত 2.c4 খেলে কেন্দ্রর উপর দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, কালো ও লড়াই করে। চালের খুটিনাটি আমরা পরে শিখবো।

আর  1…d5  ছাড়া অন্য চাল খেলা হলে তবে তাকে বলা হয় semi closed game.

1.d4 এর উত্তরে 1…d5 ছাড়া আর একটা খুব জনপ্রিয় চাল হলো 1…Nf6. এই চালের পর দ্বিতীয় চালে সাদার পক্ষে 2.e4 খেলা সম্ভব নয়, কারন e4 ঘরের রক্ষণ নেই। 1…Nf6 এর পর সাদা এবং কালোর চালের উপর নির্ভর করে খেলা অনেক রকম ভাবে চলতে পারে, তবে খেলা যেভাবেই চলুক না ক্যানো কেন্দ্রের দখল এবং দ্রুত ঘুটির বিকাশ সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয়। একটা সম্ভাব্য চাল হলো 1.d4 Nf6 2.c4 e6 3.Nc3 Bb4!

শেষ চালের মাধ্যমে কালো সরাসরি e4 ঘরের দখলের জন্য লড়াই করছে।

এছাড়া কালোর পক্ষে অনান্য চাল খেলা সম্ভব। যেমন 1…f5 এর মাধ্যমে e4 ঘরের দখল নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে খেলার একদম শুরুতে f-pawn চাললে রাজার নিরাপত্তা একটু আলগা হয়, তাই খেলার শুরতেই এইভাবে খেলা খুব একটা জনপ্রিয় নয়।

আমরা queens pawn opening সম্বন্ধে আলোচনা এখানেই শেষ করবো।

ফ্ল্যাঙ্ক ওপেনিং

1.c4/f4 etc

রাজার ঘরের বোড়ে বা মন্ত্রীর ঘরের বোড়ে চালের মাধ্যমে খেলা শুরু করা ছাড়া সাদার কাছে আর দু একটা ভালো চাল আছে। যেমন 1.c4 বা 1.f4. প্রথম চালটা দ্বিতীয় চালের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়, কারন খেলার একদম শুরুতেই f-pawn চাললে রাজার রক্ষণ একটু দুর্বল হয়। কেন্দ্রের বোড়ে ছাড়া অন্য কোন বোড়ে দিয়ে খেলা শুরু করলে তাকে বলা হয় flank opening.

ইন্ডিয়ান ওপেনিং

1.d4 Nf6 2.c4 g6 3.Nc3 Bg7 4.e4 d6 5.Nf3 0-0 6.Be2 e5/c5!!(strike in the center) – [kings indian defense]

এতক্ষণ অবধি আমরা যতগুলো উদাহরণ দেখলাম তার প্রত্যেকটিতে সাদা এবং কালো দুজনেই একদম শুরু থেকে সরাসরি বোড়ে দিয়ে কেন্দ্রের দখলের জন্য লড়াই করছে। তবে বোড়ে দিয়ে কেন্দ্র দখল ছাড়াও আর একরকম ভাবে খেলা শুরু করা যেতে পারে। এই ওপেনিং এ খেলার একদম শুরুতে কয়েকটা চাল কেন্দ্রের সরাসরি দখল স্থগিত রেখে খুব দ্রুতগতিতে অনান্য ঘুটিকে কেন্দ্র দখলের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এর জন্য প্রধানত গজ কে খেলার শুরুর দিকে বোর্ডের কোনাকুনি বরাবর বসানো হয়। এর জন্য দরকারী চাল হলো g6,Bg7 বা b6, Bb7. এরকম ভাবে বোর্ডের কোনাকুনি বরাবর গজ সাজানো কে দাবার ভাষায় বলে fianchetto করা। এই রকম ওপেনিং এর বিশেষত্ত হলো ঠিক সময় বুঝে প্রতিপক্ষের কেন্দ্রের বোড়ে কে আক্রমণ করে কেন্দ্রের দখলে ভাগ বসানো। কেন্দ্র কে আক্রমণ করার সময় (timing) এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপুর্ণ, একটু আগে-পরে হয়ে গেলে খুব সমস্যা। তাই এই ধরণের খেলা সাধারণত শুরুর দিকে প্রচন্ড জটিল হয়। এবং সাধারণত কালো ঘুটি নিয়ে এরকম ভাবে খেলা হয়। এই ধরণের সমস্ত রক্ষণ কে একটা গ্রুপে ফেলা যায়। এরকম রক্ষণের নাম indian defenses.

ট্রান্সপোজিশনাল ওপেনিং

এছাড়া একদম প্রথম চালে সাদা 1.Nf3 খেলতে পারে। এই চাল কে কোন একটা ওপেনিং এর ক্যাটেগরি তে ফেলা কঠিন, কারন এতে একটা ঘুটির বিকাশ হয়, কিন্তু কালোর চালের উপর নির্ভর করে সাদা পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী d4/c4/e4 এর কোন একটা চাল খেলতে পারে। যেমন, 1.Nf3 d5 2.d4 খেলা হলে দ্বিতীয় চালের পর খেলা কুইন্স পন ওপেনিং এ পরিণত হয়, 1.Nf3 c5 2.c4 খেলা হলে ফ্ল্যাঙ্ক ওপেনিং-এ পরিণত হয়, 1.Nf3 c5 2.e4 খেলা হলে কিংস পন ওপেনিং-এ পরিণত হয়। এরকম ভাবে কায়দা করে একরকম চাল দিয়ে খেলা শুরু করে অন্য ওপেনিং এর পজিশনে পৌছে যাওয়া কে দাবার ভাষায় opening transposition বলা হয়।

সংক্ষেপে বললে, দাবা ওপেনিং এর রকমভেদ নিচের মতো

1. kings pawn opening

– open games

1.e4 e5

-semi open games

1.e4 other

2. queens pawn opening

-closed games

1.d4 d5

-semi closed games

1.d4 other

3. flank openings

1.c4/f4 etc

4. indian openings

fianchetto followed by quick strike in the center

4. transpositional openings – এরকম খেলা একটা সময়ের পর সাধারণত উপরের চারটে ওপেনিং এর কোন একটার রূপ ধারণ করে।

একদম নতুন খেলোয়াড় দের জন্য open games are closed games বা 1.e4 e5 এবং 1.d4 d5 খেলা উচিত, কারন এই ওপেনিং গুলো বোঝা অনেক সোজা, তাই অনান্য জটিল ওপেনিং অভ্যাস করার আগে এগুলো শেখা জরুরি। দাবা মহলে বলা হয় একদম শুরুতে open game খেললে খেলা শিখতে সুবিধা হয়। সুতরাং আপনারা কোন ওপেনিং খেলা উচিত এই ব্যাপারে মতামত চাইলে আমি ওপেন গেম খেলতে বলবো। একটু অভিজ্ঞতার পর নিজের ইচ্ছেমতো অনান্য যে কোন ওপেনিং খেলতে পারেন।

ওপেনিং নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা আমরা এখানেই শেষ করবো। এরপর আমরা উদাহরণ হিসাবে খুব ভালো দুটো ওপেনিং সম্বন্ধে আর একটু জানবো। একটা ওপেনিং রাজার ঘরের বোড়ে দিয়ে শুরু, আর অন্য টা মন্ত্রীর ঘরের বোড়ে দিয়ে শুরু।

chess101-lecture 9.2

এই লেকচার টা পড়ার আগে আগের লেকচার টা পড়তেই হবে। নয়তো বুঝতে পারবেন না। আমি ধরে নেবো সবাই আগের লেকচার টা পড়ে তারপর এটা পড়তে শুরু করবেন। সুতরাং এই লেকচার পড়ার সময় খেলার প্রাথমিক ভাগের নিয়মাবলী সম্বন্ধে সাধারণ পরিচিতি থাকবে।

খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে প্রারম্ভিক ভাগের মূল লক্ষ্য তিনটি ১/যত সম্ভব দ্রুতগতিতে ঘুটির বিকাশ ২/কেন্ত্রের দখল/নিয়ন্ত্রণ এবং ৩/রাজার নিরাপত্তা। এই তিনটি জিনিস ভালোভাবে অভ্যাসের জন্য কি করা উচিত/উচিত নয় তার জন্য দশটা সাধারণ নিয়ম দিয়েছি। নিয়মগুলো সংক্ষেপে হলো

1.develop

2.develop

3.develop

4.control the center

5.don’t move the same piece twice

6.don’t bring the queen out too early

7.castle early

8.connect rooks

9. develop plans,  not just pieces

10. have a future goal – attack toward the direction of the pawn chain.

প্রথম ৮ টা নিয়ম বোঝা খুব সহজ, শেষের দুটো নিয়ম বোঝার জন্য কোন শর্টকার্ট নেই, অনেক কিছু শেখা দরকার, তবে প্রথম ৮ টা নিয়ম ভালোভাবে মেনে খেললে ওপেনিং বেশ ভালো খেলতে পারবেন। তবে খেলা ভালোভাবে শেখার জন্য অভিজ্ঞতা দরকার। তবে অনেক অভিজ্ঞতা হলেও ঠিক আপ্রোচ নিয়ে না এগোলে অনেক অভিজ্ঞতার পরেও উন্নতি করা কঠিন।

আর একটা ভালো টিপসঃ প্রত্যেকটা খেলার শেষে – খেলার ফল যাই হোক না ক্যানো – নিজের খেলার একটা বা দুটো ভুল খুঁজে বার করার চেষ্টা করুন, এবং সেই ভুল দ্বিতীয় বার যাতে না হয় তা মাথায় রাখুন, তাহলে খুব দ্রুতগতিতে আপনার উন্নতি হবে। অনেকেই বছরের পর বছর একই ভুল করে চলে, সেই জন্য সময়ের সাথে উন্নতি করে না। দাবায় উন্নতির জন্য নিজের ভুল বোঝা খুব জরুরি। অনেকেই একটা খেলায় বাজেভাবে হেরে যাবার পর সেই খেলা ভুলে যেতে চান, এবং পরে কখনো আবার সেই একই ভুল করেন। এসবের সাথে দাবা খেলার সরাসরি যোগ নেই, পুরোটাই সাইকোলোজি। তাই দাবায় উন্নতির জন্য psychological block  কাটিয়ে ওঠা এবং ভুল স্বীকার করার গুণ খুব দরকারী।

অনেকের ধারণা – আমি জিতেছি সুতরাং আমি একদম perfect খেলেছি, বা আমি হেরেছি সুতরাং আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা ভুলে যেতে চাই – এই দুই ক্ষেত্রেই আপনি খেলোয়াড় হিসাবে নিজেকে একটা সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছেন।

দাবা এমন একটা খেলা যেখানে প্রত্যেকটা চাল এর ভালো খারাপ দিক নির্মোহ ভাবে বিচার করা সম্ভব। কেও পারফেক্ট নয় – বিশ্বের বড় বড় খেলোয়াড়রা প্রায়শই বলেন –  i am happy with the results but not the quality of the games i played. বা এককথায় বললে, রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চালের কোয়ালিটি ও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারন প্রতিপক্ষ যথেষ্ঠ ভালো না হলে একই রকমের বাজে চালের মাধ্যমে আপনি ১০০ টা গেম জিততে পারেন, কিন্তু একটা সময় পর আপনি যখন একটু ভালো খেলোয়াড় এর সাথে খেলবেন তখন আপনার বহুদিনের ব্যবহৃত বাজে অভ্যাস আপনাকে ডোবাবে।

যেমন, খেলার শুরুতে মন্ত্রী বাইরে এনে scholar’s mate জাতীয় সস্তা ট্রিক খেলে একদম কাঁচা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে আপনি অনেক দিন অনেক খেলা জিতবেন, কিন্তু আপনি যদি আপনার অভ্যাস বদল না করেন তবে আপনার উন্নতি হওয়া কঠিন। কারন স্কলার মেট ট্রিক এর বিরুদ্ধে রক্ষণ খুব সোজা।

আমার ইউনিভার্সিটি তে ভারতীয় দের দাবা খেলা টুর্নামেন্টের উদাহরণ দিচ্ছি। টুর্নামেন্টে কোন ভালো রেটেড প্লেয়ার ছিলো না – কিন্তু যারা ছিলো তারা একদম খারাপ নয়। টুর্নামেন্টের ফাইনালে আমার বিরুদ্ধে আমার প্রতিপক্ষ – আমার এক বন্ধু – scholar mate স্টাইলে খেলা ওপেন করেছিলো। ওইভাবে খেলে সে বেশ সফল, কারন ফাইনাল অবধি পৌছেছিলো। কিন্তু ওপেনিং এর পুরোটাই ট্রিক বা ব্লাফ। খেলার ফল? আমি সাদা 1.e4 e5 2.Nf3 Nc6 3.Bc4 Qf6 4. Nc3 Qg6 (going after g2 pawn, i welcomed him) 5.d3 Qxg2 6.Rg1 Qh3 (only move) 7.Bxf7+ Kxf7 8.Ng5+ K-moves 9.Nxh3.

খেলা চলেছিলো আরো ২০-৩০ চাল, কিন্তু খেলার রেজাল্ট একদম শুরুতেই ঠিক হয়ে গেছিলো। ওর ভুল কি ছিলো? ও ওপেনিং এর প্রায় সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করে মন্ত্রী দিয়ে বোড়ে শিকারে বেরিয়েছিলো। কিন্তু এরকম খেলার জন্য ওকে শাস্তি দেওয়ার মতো কেও ছিলো না, তাই সহজেই ফাইনাল অবধি চলে গেছিলো। খেলার একদম শুরুতে মন্ত্রী হানা সামলাতে না পেরে আগের রাউন্ডে অন্য খেলোয়াড়রা অনেকেই হেরে গেছিলো।

যেহেতু এতদিন ধরে ওইভাবে খেলে ভালো ফল করে আসছিলো, তাই কোনদিন মাথায় আসেনি যে এইভাবে খেলার আপ্রোচ টা পুরোপুরি ভুল। এককথায়, দাবা উন্নতির জন্য ভুল স্বীকারের ইচ্ছা/ক্ষমতা শেখার সদিচ্ছা এবং মুক্ত মন খুব জরুরি। আর শুধুমাত্র ট্রিক এর আশায় খেলা বা প্রতিপক্ষকে একদম বোকা বানানোর আশায় খেলা ঠিক নয়। কারন একটা সময় পর প্রতিপক্ষ ট্রিক সামলাতে শিখবে, এবং তার নিজস্ব কিছু ট্রিক নিয়ে হাজির হবে। যেমন আমার বিরুদ্ধে মন্ত্রী নিয়ে বোড়ে শিকারে বেরিয়ে শেষে ঘোড়ার ট্রিক এর শিকার হয়েছিলো।

scholar mate  জাতীয় সস্তা ট্রিক কে দাবার ভাষায় cheapo বলে, এবং যারা শুধুমাত্র cheapo র আশায় খেলে তাদের কে coffee house player  বলে। cheapo কাজ না করলে এই ধরনের খেলোয়াড়রা সাধারণত হতাশ হয়ে এরপর কি খেলবেন ঠিক করতে পারেন না।

এত কথা কেন বললাম? কারন সস্তা ট্রিক নির্ভর খেলা খেলে একটা লেভেল এর পর সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাই খেলার সময় সমস্ত পজিশনে আপনার বুদ্ধি অনুযায়ী সেরা চাল টা খেলার চেষ্টা করুন।

একটা সময় পর সস্তা ট্রিকি প্লেয়ার বুঝতে পারে যে এইভাবে আর কাজ হচ্ছে না। তখন অনেকের ধারণা হয়, “আমি জিততে পারছি না কারন আমি কাসপারভের মতো ওপেনিং খেলছি না।” সুতরাং শুরু হয় ওপেনিং নিয়ে পড়াশুনা এবং তাবড় গ্রান্ডমাস্টার দের চাল না বুঝে মুখস্থ করার প্রচেষ্টা। চাল বুঝে নকল করা খারাপ নয়, তবে না বুঝে নকল করার ফল সাধারণত ভালো হয়না।

এই আপ্রোচ টাও সমান মারাত্মক। কাসপারভ বা আনন্দ এর মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কোন চাল খেলছে মানে চালগুলো নিশ্চয় ভালো, কিন্তু চালগুলো কেন ভালো তা না বুঝলে তার ফল খারাপ হবে।

খুব জটিলতার মধ্যে না গিয়ে একটা খুব সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। একটা খুব জনপ্রিয় ওপেনিং কারো কান ওপেনিং এর একটা ভ্যারিয়েশন। 1.e4 c6 2.d4 d5 3.Nc3 dxe4 4.Nxe4 Nd7 5.Ng5 Ngf6 6. Bd3 e6 7.N1f3 h6??

এটা ১৯৯৭ সালের ডিপ ব্লু নামক কম্পুটারের সাথে কাসপারভের খেলার একটা পজিশন। এই পজিশন টা কোন সাধারণ কম্পুটার প্রোগ্রামে চালিয়ে দেখুন, কম্পুটার বলবে পজিশন প্রায় সমান সমান। কিন্তু দাবার যে কোন পজিশন কম্পুটারের জন্য বোঝা এত সহজ নয়। কালোর শেষ চাল ২৮০০ রেটিং লেভেলে 7…h6 একটা ব্লান্ডার, কারন এর উত্তরে সাদার পরের চাল হবে একটা খুব শক্তিশালী সাক্রিফাইস 8.Nxe6!! এবং এরপর সাদা কালো দুজন যাই খেলুক না কেন, ঘুটি কম থাকা সত্ত্বেও সাদার জয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। তবে পজিশন টা প্রচন্ড জটিল, কোন ১০ বা ২০ চালের সহজ কিস্তিমাত জাতীয় কিছু নেই, তাই এই জেতা পজিশন জিততে কাসপারভ এর লেভেলের বা অন্তত ২৭০০+ রেটিং লেভেলের প্লেয়ার দরকার। জটিল পরিস্থিতিতে সাদা প্রচন্ড শক্তিশালী আক্রমণ গড়ে তোলার সুযোগ পায়, এবং ২০-৩০ চাল পর হয় কালোর রাজাকে কিস্তিমাত করে দেবে নয়তো অনেক ঘুটি জিতে নেবে। আমি যেই খেলার কথা বলছি সেটিতে খেলাটিতে কাসপারভ মাত্র ১৭ চালে হেরে গিয়েছিলেন। পুরো খেলাটা এখানে দিয়ে দিচ্ছি।

1.e4 c6 2.d4 d5 3.Nc3 dxe4 4.Nxe4 Nd7 5.Ng5 Ngf6 6.Bd3 e6
7.N1f3 h6 8.Nxe6 Qe7 9.O-O fxe6 10.Bg6+ Kd8 11.Bf4 b5 12.a4
Bb7 13.Re1 Nd5 14.Bg3 Kc8 15.axb5 cxb5 16.Qd3 Bc6 17.Bf5 exf5
18.Rxe7 Bxe7 19.c4 1-0
এতো উপরের লেভেলের খেলার চাল নিয়ে মন্তব্য করার সাধ্য আমার নেই, তাই শুধু চালগুলো দিলাম। কোন একটা নির্দিষ্ট খেলা নিয়ে আলোচনা দেখতে চাইলে chessgamesdotcom ভালো জায়গা, উৎসাহী জনতা দেখতে পারেন।

7…h6 চাল টা একটা অতি পরিচিত ওপেনিং ট্রাপ/ব্লান্ডার। দাবার জগতে এরকম অনেক ট্রাপ আছে, যেগুলো সহজে দেখে বোঝা যাবে না, কিন্তু একদম উপরের লেভেলের প্লেয়ার দের কাছে এগুলো জলভাত। কাসপারভ কি তাহলে এই ট্রাপ টা সম্বন্ধে জানতেন না? এককথায় সহজ উত্তর, হ্যা জানতেন। caro kann defense নিয়ে কাসপারভ এর বিখ্যাত বই আছে। সেই বইয়ে এই ট্রাপ নিয়ে অনেক লেখা আছে। এবং বই এর বাইরেও কাসপারভের নিজস্ব প্রস্তুতি অনেক আছে।

তাহলে কাসপারভ এরকম খারাপ চাল কেন খেলেছিলেন? এর পিছনে দাবার বাইরের অনেক গল্প আছে। সেই গল্প বোঝার জন্য কাসপারভ ডিপ ব্লু কে নিয়ে বানানো একটা ঘন্টা দেড়েকের ডকুমেন্টারি আছে, উৎসাহী জনতা দেখতে পারেন। ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

আমরা টপিকে ফিরে আসবো। ধরা যাক আমি এই অবস্থায় সাদা নিয়ে খেলছি। 8.Nxe6 কি আমার জন্য ভালো চাল? সম্ভবত নয়। কারন একটা ঘোড়া সাক্রিফাইস করলে আমাকে তারপর আক্রমণে সফল হতেই হবে, নয়তো বাড়তি ঘুটি নিয়ে খেলার শেষে কালো জিতে যাবে। এই পজিশন টা একদম নিখুঁতভাবে খেলা খুব কঠিন, এবং সেটা আমার আয়ত্তের বাইরে। তাই কাসপারভ গেম এর চাল কপি করা আমার জন্য ভালো হবে না।

এরকম একটা পজিশন সম্বন্ধে আমি একটু গল্প জানি, কারন এটা বিখ্যাত। এরকম আরো অনেক ট্রাপ আছে। স্বাভাভিকভাবেই বেশিরভাগ ট্রাপ সম্বন্ধে আমার কোন ধারণা নেই। কিছু ট্রাপ সহজ। সেগুলো শিখে রাখলে কাজে লাগবে। কিন্তু একরম কঠিন ট্রাপ শেখা আমার জন্য প্রাকটিক্যাল নয়, কারন এর চেয়ে অনেক দরকারী জিনিস পত্র শেখার আছে।

তাই hope chess খেলা বা না বুঝে super grandmaster দের কপি করা, দুটোই খারাপ। তাই নিজের আয়ত্তের মধ্যে থেকে সেরা চাল খেলার চেষ্টা করুন। আর আপনার চেয়ে একটু ভালো খেলোয়াড় দের সাথে খেলার চেষ্টা করুন, এবং খেলার শেষে তাকে জিজ্ঞ্যেস করুন কোথায় কোথায় আর একটু ভালো খেলা যেতো। এরকম করলে আস্তে আস্তে আপনার খেলার উন্নতি হবে। অথবা আপনার খেলা রিভিউ করতে চাইলে এখানে পোষ্ট করতে পারেন, আমি আমার সাধ্যমত রিভিউ করবো।

এই লেখাটা এখানেই শেষ করছি। পরের লেখায় কিছু বহুল প্রচলিত ওপেনিং নিয়ে কথা বলবো।

 

chess101-lecture09

আমাদের এই লেকচারের উদ্দেশ্য হলো খেলার শুরুর দিক – ওপেনিং বা প্রারম্ভিক ভাগ পরিচালনা করতে শেখা। ওপেনিং শেখার জন্য আমরা দশ টা সাধারণ নিয়ম শিখবো।

১/ সমস্ত ঘুটি বাইরে আনুন (develop your pieces)

খেলার শুরুতে সমস্ত ঘুটি প্রথম সারিতে থাকে। সামনে বোড়ের বাধা। বোড়ের বাধা সরিয়ে সমস্ত্ ঘুটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাইরে আনুন। খেলায় জিততে গেলে সমস্ত ঘুটিকে একসাথে ব্যবহার করা শিখতে হবে। সমস্ত ঘুটি বাইরে না আসা অবধি প্রতিপক্ষকে আক্রমণ থেকে বিরত থাকুন। নতুন খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা সমস্ত ঘুটিকে একসাথে ব্যবহার করতে জানে না, অল্প সংখ্যক ঘুটি -১ টা বা ২ টো ঘুটি নিয়ে – প্রতিপক্ষকে আক্রমনের চেষ্টা করে। অনেক সময় প্রতিপক্ষ খারাপ খেলোয়াড় হলে এরকম আক্রমণ সামলাতে না পেরে সহজে পরাজিত হয়, তবে সব সময় খেলার ফল দিয়ে খেলার চাল বিচার করার ধারনা ভুল।

সাধারণত কোন একটা খেলায় বিজয়ী খেলোয়াড় এর সমস্ত চাল ভালো চাল হয়না, এবং পরাজিত খেলোয়াড় এর সমস্ত চাল খারাপ চাল হয়না। একটা সাধারণ খেলায় ভালো খারাপ মাঝারি সমস্ত রকমের চাল মিলে মিশে থাকে। এই কথাটা যে আজকে এইমাত্র খেলা শিখেছে থেকে শুরু করে বিশ্বচাম্পিয়ন এর খেলা – সব খেলার জন্যই সত্যি।

যুদ্ধ প্রস্তুতির আগে একটা বা দুটো ঘুটি দিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা (premature attack) একটা প্রচন্ড বাজে অভ্যাস। এই অভ্যাস কাটিয়ে না ওঠা অবধি আপনার খেলায় উন্নতির সম্ভাবনা কম। কারন আপনি ভুল জিনিস অভ্যাস করে চলেছেন। এরকম ভাবে খেলা নতুন খেলোয়াড়দের বিপক্ষে দু একবার সফল হওয়া সম্ভব, তবে একটু ভালো খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে সাধারণত সফল হবেন না, কারন এরকম আক্রমণ প্রতিহত করা একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের পক্ষে খুব একটা কঠিন নয়। বিফল আক্রমনের পিছনে চাল দিতে সময় নষ্ট হয়। সেই সময় ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ সমস্ত ঘুটি বাইরে এনে ভালো অবস্থায় পৌছে যায়, এবং খুব সহজেই খেলার রাশ নিয়ন্ত্রণ করে, এবং সাধারণত সহজে জয়ী হয়।

২/ সমস্ত ঘুটি বাইরে আনুন (develop your pieces)

সুতরাং দ্বিতীয় নিয়ম টাও প্রথম  নিয়মটার মতোই। আরও ঘুটি বাইরে আনুন। সমস্ত ঘুটি বাইরে আনুন। যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত ঘুটি বাইরে না আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই নিয়ম টা আবার স্মরণ করুন। যতদিন অবধি না এই নিয়ম টা জল/পানি খাবার মত অভ্যাসে পরিনত হচ্ছে ততদিন ধরে এই নিয়মটা মেনে খেলা পরিচালনা করার চেষ্টা করুন। আমি ঘুটির বিকাশের কথা বারবার বলছি কারন এর চেয়ে দরকারি আরও কোনও নিয়ম নেই। সুতরাং ঘুটির বিকাশের কোনও বিকল্প নেই।

ঘুটি বাইরে ভালো জায়গায় এসে গেলে তাকে ডেভেলপড বা বিকশিত ঘুটি বলা চলে। একটা ঘুটি কে বিকশিত করতে যতটা সম্ভব কম চাল ব্যয় করুন। অর্থাৎ একটা চালে দুটো ঘুটির বিকাশ সম্ভব হলে তা একটা ঘুটির বিকাশের চেয়ে ভালো চাল হবে, এরকম। ঘুটির বিকাশ বলতে আমি বোড়ে বাদ দিয়ে অন্য ঘুটি বোঝাচ্ছি। বাংলায় ঘুটি শব্দ টা বেশ গোলমেলে। ইংরিজিতে বোড়ে কে pawns বোড়ে ছাড়া বাকি সমস্ত ঘুটিকে সংক্ষেপে pieces বলে।

বোড়ের চালের পিছনে যতটা সম্ভব কম সময় নষ্ট করুন। মাথায় রাখবেন বোড়ের চালে কোন ঘুটির বিকাশ হয়না, তাই অনর্থম বোড়ের চাল দেওয়া মানে অহেতুক সময় নষ্ট করা। অহেতুক সময় নষ্ট করা খারাপ। শুধুমাত্র অন্য ঘুটির বিকাশের পথ তৈরীর জন্য বোড়ের চাল চালুন। খেলার শুরুতে মাত্র একটা বা দুটো বোড়ে চালের মাধ্যমে সমস্ত ঘুটির চালের জন্য লাইন তৈরী করার চেষ্টা করুন।

৩/ সমস্ত ঘুটি বাইরে আনুন (develop your pieces)

সুতরাং তৃতীয় নিয়মটাও প্রথম ও দ্বিতীয় নিয়মটার মতোই। তার কারন ডেভেলপমেন্ট প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ। খেলার শুরুতে ঘুটির বিকাশ এর পিছনে সমস্ত চিন্তাভাবনা ব্যয় করুন।

আমরা এতক্ষণে জেনেছি ঘুটির বিকাশ খুব গুরুত্বপূর্ণ, এবং খুব বেশী সংখ্যক বোড়ের চাল ঘুটির বিকাশে সাহায্য করে না। সুতরাং বোড়ে বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত ঘুটির বিকাশে জোর দেওয়া উচিত। ছোটো ঘুটি মানে ঘোড়া ও গজ, আর বড় ঘুটি মানে নৌকা ও মন্ত্রী।  কিন্তু কোন ঘুটির বিকাশ সবার আগে ভালো?

এর উত্তর সহজ। সবার আগে ছোটো ঘুটির বিকাশের মাধ্যমে খেলা শুরু করুন। সবার আগে ঘোড়া ও গজ বাইরে আনার চেষ্টা করুন। সাধারণত প্রথমে ঘোড়া তারপর গজ বাইরে আনা ভালো, কারন খেলার শুরুতে ঘোড়ার চালের জন্য কম সংখ্যক ভালো ঘর থাকে, সেই তুলনায় গজ এর চালের জন্য একধিক ভালো ঘরের সম্ভাবনা থাকে। তাই আগে ভালো ঘরে ঘোড়ার চাল দেবার পর সুযোগ বুঝে সবচেয়ে ভালো ঘরে গজের চাল দেওয়া ভালো।

৪/ খেলার শুরুতে একটা ঘুটি একবার এর বেশি চালবেন না

আগের তিনটি নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই নিয়মটা বানানো। ঘুটি বিকাশের সময় আপনাকে যত সম্ভব কম সময় ব্যয় করার চেষ্টা করতে হবে। তাই প্রত্যেকটা চালের পিছনেই একটা উদ্দেশ্য থাকতে হবে। উদ্দেশ্যহীন চাল কখনও ভালো হতে পারে না। সম্ভব হলে একটা চালের মাধ্যমে একটার বেশি উদ্দেশ্য পূরণ করার চেষ্টা করুন। যেমন একটা চালের মাধ্যমে দুটো ঘুটির বিকাশ সম্ভব হলে তা একটা ঘুটির বিকাশের চেয়ে ভালো চাল, ইত্যাদি।

এতক্ষণে আমরা নিশ্চয় বুঝেছি যে একটা ঘুটি অকারণে একবারের বেশি চালা মানে অহেতুক সময় নষ্ট। ওই চালটি হয়তো অন্য কোন ভালো কাজে ব্যবহার করা যেতো। তাই খেলার শুরুতে বিশেষ দরকার ছাড়া একটা ঘুটিকে একবারের বেশি চালবেন না। সমস্ত ঘুটি বাইরে না আসা অবধি এই নিয়মটা মেনে চলুন, আপনার পক্ষে খেলা পরিচালনা করা অনেক সহজ হবে।

অবশ্য বিশেষ ক্ষেত্রে এই নিয়ম এর ব্যতিক্রম আছে। যেমন, যদি বিপক্ষ বিনামূল্যে বড়ো ঘুটি খেতে দেয় তাহলে তা খাবার জন্য একটা ঘুটি দুবার চালা যেতে পারে। তার কারন একটা ঘুটি খাবার জন্য সময় নষ্ট হলেও তার পরিবর্তে আপনি যে বড়ো ঘুটি পাচ্ছেন সাধারণত তার মূল্য একটা চালের পিছনে নষ্ট সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। অনেক সময় আপনার কোনো বড়ো ঘুটি আক্রান্ত হলে সেই আক্রমণ সামলাতে আপনাকে একটা বাড়তি চাল নষ্ট করতে হতে পারে।

৫/ খেলার একদম শুরুতে মন্ত্রী বাইরে আনবেন না

মন্ত্রী সবচেয়ে শক্তিশালী, তাই অন্য কোনো ঘুটির বদলে মন্ত্রী খাওয়া গেলে সেটা লোকসান। একদম শুরুতেই বড় ঘুটি যেমন মন্ত্রী বাইরে আনা খারাপ। এতে বিপক্ষ বাইরে আসা মন্ত্রী কে বারবার আক্রমণ করে নিজের ঘুটি কে বাইরে বার করবে, আর ছোটো ঘুটির হাতে মারা যাওয়ার ভয়ে মন্ত্রী সারা বোর্ড জুড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে জেতে বাধ্য হবে। অনেক সময় অনেক ছোটো ঘুটির মধ্যে মন্ত্রী বন্দি হয়েও যেতে পারে। তাই মন্ত্রীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আপনি বার বার মন্ত্রী চালতে বাধ্য হবেন। ফলে অনান্য ঘুটি চালবার সময় পাবেন না। এবং অনান্য ঘুটির বিকাশে পিছিয়ে পড়বেন। এই সমস্ত কারনে খেলার শুরুতেই মন্ত্রী বাইরে আনা প্রথম চারটে নিয়মের বিপক্ষে যায়। সুতরাং মন্ত্রীর চালের বদলে অনান্য ঘুটির চালের পিছনে সময় ব্যয় করা উচিত। অনান্য সমস্ত ঘুটি বাইরে আনা হয়ে গেলে খেলার পরিস্থিতি বুঝে কোন নিরাপদ জায়গা দেখে মন্ত্রীর চাল দেওয়া উচিত, যাতে মন্ত্রী সহজেই আক্রান্ত না হয়।

ঠিক একই রকম কারনে খেলার শুরুতেই নৌকা বাইরে আনা উচিত নয়।

৬/ মাঝমাঠ দখল করুন

আমরা এখনও অবধি ঘুটির বিকাশের গুরুত্ব সম্বন্ধে জেনেছি। এবার ঘুটির বিকাশ কোথায় কিভাবে করবো সেই নিয়ে একটু আলোচনা করবো।

একটা বোর্ডে মোট ৬৪ টা ঘর থাকে। এই ৬৪ টা ঘরের প্রত্যেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়, বোর্ডের মাঝের ঘর বোর্ডের প্রান্তের বা কোনার ঘরের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা ফুটবল খেলার কথা ভাবুন। একটা দলের খেলোয়াড়রা মাঠের একদম প্রান্তে থেকে খেলার চেষ্টা করছে, আর অন্য দলের খেলোয়াড়রা মাঠের একদম মধ্যিখানে থেকে খেলছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় দলের জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারন মাঝমাঠ দখলে থাকার ফলে দ্বিতীয় দলের খেলার প্রতি নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি থাকবে। দাবা খেলাও একই রকম। মাঝমাঠের দখল যার থাকে খেলার রাশ তার হাতে থাকে। তাই খেলার একদম শুরুতে সমস্ত ঘুটির দ্রুত বিকাশের সাথে সাথে মাঝমাঠ দখল বা নিয়ন্ত্রনের প্রতি নজর দেওয়া উচিত। দাবা বোর্ডের মাঝমাঠ বলতে d4,e4,d5,e5 এই চারটে ঘর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাই যে কোন ভালো ওপেনিং এ এই চারটে ঘরের দখলের চেষ্টার মাধ্যমে খেলা শুরু হয়। আমরা পরের লেকচারে উদাহরণ সমেত এই ব্যাপারটা আরো ভালো করে জানবো।

মাঝমাঠ দখলের সবচেয়ে স্বাভাবিক উপায় হলো বোড়ে দিয়ে ঘর দখল করা। তাহলে এই নিয়ম অনুযায়ী কোন প্রথম চাল টা সবচেয়ে ভালো? উত্তরঃ 1.e4 বা 1.d4. এর বদলে 1.h4 বা 1.a4 চাল দেওয়া হলে বোর্ডের কেন্দ্র বা মাঝমাঠ দখল করা হয় না, তাই এই চালগুলো ভালো নয়।
খেলার শুরুর দিকে খুব বেশি বোড়ের চাল দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বোড়ে একবার সামনে এগিয়ে গেলে আর কখনও পিছনে আস্তে পারে না। তাছাড়া একা বোড়ে সামনে এগিয়ে গেলে বিপক্ষ সময় বুঝে একা এগিয়ে যাওয়া বোড়ে কে সহজেই আক্রমণ করবে। এতে বিপক্ষের সুবিধা। প্রথম প্রথম খেলা শিখলে খেলার শুরুতে শুধুমাত্র রাজা এবং মন্ত্রীর সামনের বোড়ে দুটো চালুন। অকারনে আর কোনো বোড়ে চাল দেওয়ার দরকার নেই। অন্যভাবে বলতে গেলে, দুটো হাতি বাইরে আনতে সর্ব্বনিম্ন যে পরিমাণ বোড়ের চাল দরকার শুরুতে তার বেশি বোড়ের চাল দেওয়া ভাও নয়। ্তবে সহজে মাঝমাঠের দখল ছেড়ে দেওয়া ভালো নয়, তাই আপনার মাঝমাঠের বোড়ে আক্রান্ত হলে মাঝমাঠে বোড়ের দখল টিকিয়ে রাখতে বোড়ের চালের বিশেষ প্রয়োজন হলে কেবলমাত্র তবেই অন্য বোড়ে চালা যেতে পারে। বা প্রতিপক্ষের মাঝমাঠের দখল খুব ভালো হলে সেই দখলে ভাগ বসাবার জন্য কেন্দ্রের বোড়ে কে আক্রমণ করতে অনেক সময় বোড়ের চাল দেওয়ার দরকার হয়। এই ধরনের চালকে বলা হয় break move. তবে এই ধরণের বোড়ের চালের আগে সাধারণত প্রস্তুতি দরকার হয়। সমস্ত ঘুটির যথেষ্ঠ ভালো বিকাশ সমাপ্ত হলে তবেই break move  খেলা উচিত। এই ধরনের চাল সম্বন্ধে আমরা পরে আরও শিখবো।

৭/ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাসল করে রাজার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করুন।

খেলায় রাজার নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারন রাজা কে কিস্তিমাত করা সম্ভব হলে খেলা সমাপ্ত হয়। বোর্ডের মধ্যভাগে রাজা সবচেয়ে নিরাপদ নয়, তাই সাধারণত খেলার শুরুতে কাসলিং এর মাধ্যমে রাজা কে কোনো এক প্রান্তে রাখা হয়। কাসলিং এর বাড়তি সুবিধা হলো এতে মাত্র একটা চাল ব্যয় হয়, এবং কাসলিং এর ফলে নৌকার  মধ্যে সহজে সংযোগ স্থাপন হয় এবং নৌকা সহজে খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
৭ থেকে ১০ চাল এর মধ্যে কাসলিং এর চেষ্টা করুন। রাজার দিকে কাসল করতে কম সময় লাগে, তাই সাধারনত রাজার দিকে কাসল করা ভালো। রাজার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সাধারণত রাজার সামনের বোড়ে অকারনে চালা উচিৎ নয়। কারন বোড়ে রাজাকে বিপক্ষের আক্রমণের হাত থেকে নিরাপত্তা প্রদান করে।

৮/ দুই নৌকার মধ্যে সংযোগস্থাপন করুন ( connect the rooks)

খেলার শুরুর ভাগ সঠিকভাবে পরিচালনা করলে একটা সময়ে কাসলিং এর পর (৭-১০চাল) দুই নৌকার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরী হবে। ঘুটির ডেভেলপমেন্ট এর মাঝপথে সবকিছু ভুলে হঠাৎ আক্রমণ করতে যাবার আগে আপনার দুই নৌকার মধ্যে সংযোগস্থাপন হয়েছে কি না খেয়াল করুন। সংযোগ তৈরী না হলে সতর্ক থাকুন, কারন আপনি ওপেনিং ঠিকভাবে পরিচালনা করেননি। অপরপক্ষে দুই নৌকার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে মানে আপনি খেলার শুরুর ভাগ ঠিকভাবে সব নিয়ম মেনে পরিচালনা করেছেন এবং ডেভেলপমেন্ট সম্পুর্ণ করেছেন। অর্থাৎ আপনি ১/সমস্ত ঘুটি বাইরে নিয়ে এসেছেন ২/কেন্দ্রের দখল নেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং ৩/কাসলিং এর মাধ্যমে রাজার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছেন। সুতরাং দুই নৌকার মধ্যে যোগাযোগ তৈরী হলে ওপেনিং সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে বলা চলে।

৯/ পরিকল্পনা মাফিক খেলুন এবং প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বোঝার চেষ্টা ও প্রতিহত করার চেষ্টা করুন।

আশা করি এতক্ষণে আমরা ওপেনিং এর সবচেয়ে প্রাথমিক ব্যাপারগুলো শিখে নিয়েছি। এবার আমরা একধাপ উপরে উঠবো।  সেনাবাহিনী বাইরে আনার সময় একটা পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং সেই পরিকল্পনা মাফিক খেলা কে এগিয়ে নিয়ে যান। প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বোঝার চেষ্টা করুন এবং সাধ্যমত সেই পরিকল্পনা প্রতিহত করার চেষ্টা করুন। সমস্ত ঘুটিকে বিক্ষিপ্তভাবে বাইরে আনার চেয়ে একটা দূরদৃষ্টির কথা মাথায় রেখে সেই পরিকল্পনামাফিক সমস্ত ঘুটিকে বাইরে আনা ভালো। এমনভাবে খেলুন যাতে সমস্ত ঘুটি একসাথে একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে, একে অন্যের পথে বাধা হয়ে না ওঠে। এরকম দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা খুব একটা সহজ নয়, তাছাড়া প্রতিপক্ষ প্রত্যেক মুহুর্তে সেই পরিকল্পনায় বাধা দেবার চেষ্টা করবে। সুতরাং আপনার একটা পরিকল্পনায় আটকে থাকলে চলবে না। একটা পরিকল্পনা কাজ না করলে দ্বিতীয় বিকল্প পরিকল্পনার তৈরী করে খেলা এগিয়ে নিয়ে চলুন।
সবচেয়ে খারাপ হলো কোন পরিকল্পনা ছাড়া কোন এক চালের একটা আক্রমণ তৈরী করে আশা করা প্রতিপক্ষ আক্রমণ দেখতে পাবে না। এরকম আশামূলক দাবা (hope chess) খেললে আপনার খেলার খুব একটা উন্নতি হবে না এটা গ্যারান্টি দেওয়া যায়। তাই hope chess খেলা বাদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে সম্মান দিয়ে খেলুন। মনে রাখুন, আপনার এক চালের আক্রমণের উত্তর হিসাবে প্রতিপক্ষ ও একটা চাল পাবে রক্ষণ বা প্রতি আক্রমণের জন্য, সুতরাং সে নিশ্চয় আপনার আক্রমণ এর প্রতি নজর রাখবে। এককথায়, কোন পরিকল্পনা ছাড়া যে কোন জায়গায় আক্রমণ করলে সফল হবার সম্ভাবনা কম। প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য রক্ষণাত্মক চাল মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন, এবং এমনভাবে আক্রমণ করুন যাথে রক্ষণ খুব একটা সহজ না হয়। বা, প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গা খুঁজে বার করে সমস্ত শক্তি নিয়ে দুর্বল জায়গায় আক্রমণ করা উচিত, কারন দুর্বল জায়গা কে রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। অবশ্য নিজের ও প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গা বোঝার জন্য খেলা সংক্রান্ত জ্ঞ্যান অভিজ্ঞতা ইত্যাদি অনেক কাজে লাগে। তবে সবচেয়ে দরকারী বিষয় হলো যুক্তিযুক্ত ভাবনা (logical thinking)। অনেক সময় আপনার বিচার বিবেচনা সফল হবে না, তবে দাবা খুব জটিল খেলা, তাই অনেক বড়ো বড়ো খেলোয়াড়রাও অনেক সময় বিচার বিবেচনায় ভুল করেন, তাই ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক দিন ধরে খেললে কোন ধরনের ভাবনা সফল হতে পারে আর কোন ধরনের ভাবনার সফল হবার সম্ভাবনা কম সেই সম্বন্ধে আপনার ধারনা হবে। তাই সময়ের সাথে সাথে আপনি আরও ভালো পরিকল্পনা বানাতে সফল হবেন।
যাকগে, সাধারণ পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বললাম। এবার কিছু দরকারী তথ্য দেওয়া যাক। আপনি যখন আপনার ঘুটির বিকাশ করবেন তখন সাধারণ বিকাশের সাথে অন্য কিছু করার চেষ্টা করুন। যেমন ঘোড়া বাইরের দিকে আনার সময় প্রতিপক্ষএর কেন্দ্রের বোড়ে কে আক্রমণ করার চেষ্টা করুন। গজ বাইরে আনার সময় প্রতিপক্ষের ঘোড়া কে একটা জায়গায় আটকে রাখার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে বাইরে আনুন। নৌকা সাধারণত মুক্ত ফাইল বরাবর ভালো কাজ করে। আপনার দুই নৌকার দ্বারা মুক্ত ফাইল দখল করার চেষ্টা করুন। মন্ত্রী কে খুব তাড়াতাড়ি বাইরে না এনে সমস্ত ঘুটিকে পিছন থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা মাথায় রেখে চালুন, ইত্যাদি।

প্রত্যেকটা টুর্নামেন্ট ওপেনিং বা বহুল প্রচলিত ওপেনিং এর পিছনেই একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকে। পরের লেকচারে আমরা দু একটা ওপেনিং উদাহরণ হিসাবে দেখবো।

১০/ বোড়ের চাল সম্বন্ধে সতর্ক হোন, এবং আপনার বোড়ের গঠনের অভিমুখে আক্রমণ করার চেষ্টা করুন

বোর্ডে সমস্ত ঘুটির মধ্যে বোড়ে একমাত্র ঘুটি যে শুধুমাত্র সামনের দিকে চলতে পারে, এবং সামনে বাধা থাকলে আর এগোতে পারে না। বোড়ের চাল কখনো ফেরত নেওয়া যায় না, তাই কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়া বোড়ে এগিয়ে নিয়ে গেলে বোড়ের আশেপাশের বা পিছনের ঘর গুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এরকম দুর্বল হয়ে যাওয়া ঘরকে ইংরিজিতে বলে weak squares. এককথায় দুর্বল ঘরের ডেফিনিশন দিতে গেলে বলতে হয়, দুর্বল ঘর মানে এমন ঘর যে ঘর কে কোন বোড়ের সাহাজ্যে রক্ষা করা যায়না। খেয়াল রাখুন যাতে আপনার পজিশনে খুব বেশি দুর্বল ঘর না থাকে, এবং আপনার প্রতিপক্ষের পজিশনে দুর্বল ঘর থাকলে সেসব দুর্বল ঘরগুলো আপনি আক্রমনের জন্য ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। পজিশনাল দাবা (positional chess) বোঝার জন্য বোড়ের চাল, বোড়ের গঠন এবং দুর্বল ঘর সম্বন্ধে ধারণা থাকা খুব জরুরি।

আপনার পজিশনে বোড়ের গঠন আপনার শরীরের হাড় এর গঠনের মতো। একবার একটা গঠন তৈরী হয়ে গেলে তা আর সহজে পরিবর্তন করা যায় না।  অন্য ঘুটির একটা চাল একটা বাজে ঘরে দেওয়া হলে একটা চাল নষ্টের মাধ্যমে পরে তা সংশোধন করার সুযোগ থাকে, কিন্তু বোড়ের চাল সংশোধনের কোন সুযোগ নেই। তাই বোড়ের গঠন তৈরীর সময় খুব সতর্কভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী ভাবনা মাথায় রেখে চাল দেওয়া উচিত। এবং আপনার বাকি সমস্ত ঘুটির চাল এবং খেলার গতিপথ এবং পরিকল্পনা ঠিক করার সময় বোড়ের গঠন মাথায় রেখে ঠিক করা উচিত।

আপনার শরীরের কোন জয়েন্ট যেই দিকে বাকানো সম্ভব তার উলটো দিকে বাকানোর চেষ্টা করে দেখুন, জয়েন্ট ভেঙে যাবে। দাবার পজিশনের ক্ষেত্রেও এরকম যুক্তি খাটে। বোড়ের গঠনের উলটো পথে আক্রমণ করার চেষ্টা করলে আপনার পজিশন কয়েক চালের মধ্যেই একদম ভেঙে পড়বে। সাধারণত বোড়ের চেইন লকড হয়ে গেলে চেইনের গতিপথের অভিমুখে আক্রমণের চেষ্টা করা উচিত, এবং প্রতিপক্ষের গঠন দুর্বল করার জন্য চেইনের ভিত (base) এ আক্রমণ করার উচিত। আর আপনার চেইনের ভিত শক্ত রাখার চেষ্টা করুন, যাতে প্রতিপক্ষ সহজে চেইনের গঠন ভাঙতে আন পারে। সমস্ত ঘুটির অবস্থান এমনভাবে রাখুন যাতে সমস্ত ঘুটি মিলে আপনাকে আপনার লক্ষ্যে পৌছতে সাহায্য করে।

ওপেনিং বা প্রারম্ভিক ভাগের খুব সহজ নিয়মাবলী এই পর্যন্তই। এরপর আমরা বেশ কিছু উদাহরণের মাধ্যমে নিয়মগুলো ভালো করে বোঝার চেষ্টা করবো।

chess101-lecture07

ঘুটির আপেক্ষিক মূল্যঃ

এতদিনে আমরা নিশ্চয় বুঝেছি সব ঘুটির মূল্য সমান নয়। প্রত্যেক ঘুটির মূল্য বাকি ঘুটির চেয়ে আলাদা। তাই কোন ঘুটির কেমন শক্তি তা সম্বন্ধে ধারণা থাকা দরকার। মন্ত্রী সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বোড়ে সবচেয়ে কম শক্তিশালী। বোড়ের মূল্য ১ ধরে বাকিদের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। নিচে বিভিন্ন ঘুটির তুলনামূলক মুল্য দেওয়া হলঃ

বোড়ে = ১
গজ বা হাতি = ৩
ঘোড়া = ৩
নৌকা = ৫
মন্ত্রী = ৯

বিনিময় এর সোজা হিসাবঃ

সংক্ষেপে বলতে গেলে, দুটি নৌকা একটা মন্ত্রীর চেয়ে শক্তিশালী কারন দুটি নৌকার মূল্য ১০ এবং মন্ত্রীর মূল্য ৯, এবং দুটি হাতি বা ঘোড়া নৌকার চেয়ে শক্তিশালী দুটি হাতি বা ঘোড়ার সম্মিলিত মূল্য ৬, কিন্তু একটা নৌকার মূল্য ৫।

একটা নৌকা ৫ টা বোড়ের সমান। একটা মন্ত্রী তিনটি হাতি বা ঘোড়ার সমান, বা ৯ টা বোড়ের সমান। একটি হাতি বা ঘোড়া তিনটি বোড়ের সমান। একটা নৌকা একটি ঘোড়া বা গজ এবং দুটি বোড়ের সমান। ৫ = ৩+১+১
বেশী শক্তিশালী হওয়ার জন্য মন্ত্রী এবং নৌকা কে বড় ঘুটি [major pieces] এবং হাতি এবং ঘোড়া কে ছোট ঘুটি [minor pieces] বলা হয়।

১,৩,৩,৫,৯ হিসাব কি ভাবে ব্যবহার করবেনঃ

খেলার শুরুতে দুজন খেলোয়াড় এর ই সমান শক্তি থাকে। খেলা চলাকালীন দুজনের শক্তি বিনিময় হতে থাকে। খেলার সময় এমনভাবে খেলতে হবে যাতে খেলা এগোবার সাথে সাথে প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজের পক্ষের বেশি সেনা অবশিষ্ট থাকে। নিজের অতিরিক্ত সেনা দিয়ে অনেক সময়েই যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে খুব সহজে যুদ্ধ জেতা যায়, কারন প্রতিপক্ষের কোনো সেনা অবশিষ্ট না থাকায় প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকে না।

খেলা শেষে নিজের অতিরিক্ত সেনা টিকিয়ে রাখতে খেলার শুরু থেকে এমনভাবে সেনা বিনিময় করতে হয় যাতে নিজের কম শক্তি খরচ করে প্রতিপক্ষের বেশি সেনা খেয়ে নেওয়া যায়।

যেমন একটা ঘোড়া বা গজ এর বদলে একটা নৌকা খেয়ে নেওয়া লাভজনক। নৌকা ও গজ/ঘোড়ার বদলে মন্ত্রী খেয়ে নেওয়া লাভজনক। কারন মন্ত্রী ৯, নৌকা+গজ =৫+৩

দুটো বোড়ের বদলে একটা ঘোড়া বা গজ খেয়ে নেওয়া লাভজনক। ইত্যাদি।

এইভাবে এই নিয়ম ব্যবহার করে খুব সহজে বিনিময়ের সময় লাভ না লোকসান হচ্ছে তা হিসাব করতে পারবেন।

রাজার মূল্যঃ

রাজাকে অমূল্য ধরা হয় কারণ রাজা কে কোনো অবস্থাতেই বিনিময় করা যায় না। রাজা সাধারনত খেলার সময় যুদ্ধের অংশগ্রহণ করে না, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে নিরাপদ অবস্থানে লুকিয়ে থাকে, কারন রাজার মৃত্যুর সাথে সাথে খেলার সমাপ্তি হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে পারেন, মন্ত্রী সবচেয়ে শক্তিশালী ঘুটি, কিন্তু রাজা সবচেয়ে মূল্যবান ঘুটি।

বিনিময় সংক্রান্ত কিছু কঠিন তথ্যঃ

এই বিভাগ টা বাকি বিভাগের চেয়ে অনেক কঠিন। খুব জটিল মনে হলে এই অংশ টা এখন না পড়লেও চলবে। আরও খানিকটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর পড়তে পারেন।

হিসাবের সুবিধার্তে ১,৩,৩,৫,৯ নিয়মে গণনা করা হয়। তবে মাথায় রাখতে হবে, এই সব মূল্য খেলার সময়ে ঘুটির অবস্থানের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তাই সব সময় ঘুটির অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একটা ঘুটির আসল মূল্য বোর্ডের কোথায় আছে আর কি রকম ভাবে কতটা কাজ করছে তার উপর নির্ভর করে। তাই কোনো বিশেষ অবস্থায় কোনো ঘুটির দাম কম বা বেশি হতে পারে।
যেমন, কোনো বোড়ে বোর্ডের শেষ মাথায় পৌছে গেলে মন্ত্রী হয়ে যেতে পারে, সুতরাং বোড়ের শক্তি অনেকগুণ বৃদ্ধি পায় [১ থেকে ৯], সুতরাং অষ্টম ঘরের কাছাকাছি পৌছে যাওয়া বোড়ে ১ পয়েন্ট এর চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী, ইত্যাদি।

যারা একদম নতুন খেলা শিখছেন তাদের মনে হতে পারে ঘোড়া খুব শক্তিশালী, কারন ঘোড়া অদ্ভুতভাবে বোর্ডে চলাফেরা করে। ঘোড়ার চলন বাকি সবার চেয়ে একদম আলাদা। কিন্তু অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ঘোড়ার চাল কে মোকাবিলা করতে শেখা যায়। গ্রান্ডমাস্টার দের খেলায় বেশিরভাগ সময় গজ কে ঘোড়ার চেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে হয়। সুতরাং ঘুটির মূল্য আপেক্ষিক।
কোনো পজিশন একদম বদ্ধ (blocked) হয়ে থাকলে সাধারণত ঘোড়া গজ এর চেয়ে বেশি কাজে লাগে, কারন ঘোড়া সহজেই বাধা ডিঙিয়ে চলাফেরা করতে পারে। অপরপক্ষে বোর্ড একদম খোলা (open) থাকলে গজ এর অনেক দূর অবধি যাবার ক্ষমতা বেশি দরকারি মনে হয়। তাই বোর্ডের ঘুটি কমতে থাকলে সাধারণত ঘোড়ার শক্তি কমতে থাকে।

একটা ঘোড়া ও একটা গজ প্রায় সমান শক্তিশালী, কিন্তু দুটো গজ (bishop pair) প্রায় সব সময় দুটো ঘোড়ার চেয়ে শক্তিশালী। এর প্রধান কারন হলো, দুটো গজ দিয়ে বোর্ডের সমস্ত ঘর কভার করা যায়, কিন্তু একটা গজ দিয়ে কেবলমাত্র অর্ধেক ঘর কভার করা যায়। অর্থাৎ, দুটো গজ = একটা গজের মূল্য * ২ + কিছু টা অতিরিক্ত মূল্য। বলা হয়, একটা গজ = ৩, দুটো = ৬,৫

খেলার শুরুতে অনেক সময় একটা ঘোড়া ও গজের বদলে প্রতিপক্ষের একটা নৌকা ও একটা বোড়ে খেয়ে নেবার সুযোগ তৈরী হয়। যদিও পয়েন্টের হিসাবে দু’দল ই সমান, তবুও খেলার শুরুর দিকে সাধারণত দুটো ঘুটি নৌকা ও বোড়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। ঘোড়া + গজ = ৩+৩, নৌকা+বোড়ে = ৫+১ , কিন্তু খেলার শুরুর দিকে ঘোড়া ও গজ বেশি শক্তিশালী।

খেলার শুরুর দিকে নৌকার দাম কম মনে হয়, কারন অনেক ঘুটির মধ্যে নৌকা ব্যবহার করা কঠিন। বোর্ড খালি হবার সাথে সাথে সাধারণত নৌকার শক্তি বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া আরও কিছু কঠিন ব্যাপার আছে। যেমন, নৌকা ও গজ এর মিলিত শক্তি বেশিরভাগ সময় নৌকা ও ঘোড়ার চেয়ে বেশি। দুজনের ই পয়েন্ট সংখ্যা কিন্তু সমান। ৫ + ৩ বা ৮

আবার, মন্ত্রী ও ঘোড়ার মিলিত শক্তি প্রায় সব সময় মন্ত্রী ও গজ এর চেয়ে বেশি। এবার ও পয়েন্ট সংখ্যা সমান। ৯ + ৩ বা ১২
সংক্ষেপে, সাধারণত মন্ত্রীর সাথে ঘোড়া এবং নৌকার সাথে গজ মিলিতভাবে ভালো কাজে লাগে।

তবে, বোর্ডে কোনো বিশেষ অবস্থায় কে বেশি শক্তিশালী হবে তা নিয়ম করে বলা কঠিন। এমনকি গ্রান্ডমাস্টার রাও প্রায় ই এদের আপেক্ষিক মূল্য বুঝতে ভুল করেন, বা অনেক জটিল পরিস্থিতিতে দুজন গ্রান্ডমাস্টার সম্পুর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেন। তাই ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। প্রায় সব নিয়মের ব্যতিক্রম আছে। তবে বহুল প্রচলিত ধারণা সম্বন্ধে জেনে রাখা ভালো।

কঠিন তথ্য কিভাবে ব্যবহার করবেনঃ

এসব কঠিন তথ্য নিয়ে বেশিরভাগ খেলোয়াড় দের এখনই মাথা না ঘামালেও চলবে। বেশিরভাগ খেলায় একপক্ষ এক বা একাধিক ঘুটি অকারনে খোয়ায় (blunder), তাই সেইসব ভুলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আপনি খেলার শেষে এক বা একাধিক মন্ত্রী পেয়ে যাবেন। এবং এক বা একাধিক মন্ত্রী থাকা অবস্থায় খেলা কিভাবে জিততে হয় তা ইতিমধ্যে শিখে গেছেন আশা করি।

উপরের কঠিন তথ্য ব্যবহারের কোন সহজ  উত্তর নেই, তবে এককথায় বলতে গেলে, যখন ঘুটি বিনিময় করবেন তখন এমনভাবে করবেন যাতে বিনিময়ের পর আপনার ঘুটির প্রয়োগক্ষমতা (piece activity/applicability/usability) প্রতিপক্ষের ঘুটির ঘুটির চেয়ে বেশি হয়। যেমন, দাবায় ভালো গজ ও খারাপ গজ (good/bad bishop) এবং ভালো ঘোড়া এবং খারাপ ঘোড়ার (good/bad knight) ধারণা আছে।  খেলার শেষে আপনার ভালো গজ বা ঘোড়া এবং আপনার প্রতিপক্ষের খারাপ গজ বা ঘোড়া থাকলে আপনার সুবিধা। তাছাড়া active ও passive নৌকার ধারণা ও আছে। আপনার ভালো নৌকা ও প্রতিপক্ষের খারাপ নৌকা থাকলে আপনার সুবিধা। অনেক সময় এটুকু পার্থক্যই খেলা জেতার জন্য যথেষ্ঠ।

কিম্বা ভাবুন আপনাদের দুজনের ই একটা মন্ত্রী ও নৌকা আছে, আর একজনের গজ ও অন্যজনের ঘোড়া। প্রথমজন চাইছে মন্ত্রী বিনিময় করতে, কারন সে ভাবছে নৌকা ও গজ, নৌকা ও ঘোড়ার চেয়ে বেশি কার্যকর হবে; আর দ্বিতীয় জন চাইছে নৌকা বিনিময় করতে, কারন সে ভাবছে  মন্ত্রী ও ঘোড়া, মন্ত্রী ও গজের চেয়ে বেশি কার্যকর হবে। সহজ কথায়, ভবিষ্যতের কথা আন্দাজ করে আপনি বোর্ডে কি রাখবেন আর কি বোর্ড থেকে তুলে দেবেন তা নিয়ে খেলার পরিকল্পনা ঠিক করতে পারেন। এতে যে খেলোয়াড় শুধুমাত্র পয়েন্ট গণনা ছাড়া আর কিছু ই বোঝে না তার চাইতে আপনার খেলার পরিকল্পনা কে একধাপ উপরে তুলতে পারেন।

এই হলো একটা প্রচন্ড জটিল বিষয়ের যতটা সম্ভব সহজ গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা। তবে পরিকল্পনা করার সময় মাথায় রাখবেন এইসব নিয়মের অনেক ব্যতিক্রম আছে, তাই বিচার বিবেচনা না করে এইসব নিয়ম প্রয়োগ করা অনেকক্ষেত্রে বেশ বিপজ্জনক। কিন্তু খেলা্র সময়  আপনি যদি একটু উচুদরের ভাবনা অভ্যাস করেন, তবে ভবিষ্যত আপনার খেলায় উন্নতির সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকবে।

তবে জানিয়ে রাখি, খুব ভালো খেলোয়াড় না হওয়া পর্যন্ত এসবের ছোটোখাঁটো ব্যাপারের জন্য এখনই আপনার খেলার ফলাফলের খুব একটা পার্থক্য হবে না। ভালো খেলোয়াড় রা অকারনে আপনাকে ঘুটি খেতে দেবে না, তাই কোন খেলায় বিশাল বড় রকমের ঘুটির সুবিধা (material advantage) পাওয়া সহজ নয়। তাই আপনার খেলার যত উন্নতি হবে এসসব ছোটোখাঁটো ব্যাপার অনেক বেশি গুরুত্ত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দাবা প্রোগ্রাম কিভাবে ব্যবহার করবেনঃ

এখনো অবধি যে সমস্ত কিস্তিমাত শিখিয়েছি সেসব প্রাকটিস করতে চাইলে দাবা প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে পারেন। যারা দাবা প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে উৎসাহী এই অংশ টা তাদের জন্য। এখনই প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে না চাইলে এই অংশ টা না পড়লেও চলবে।

ইউটিউব ভিডিও লিঙ্কঃ

বিকল্প লিঙ্কঃ

chess.engine.crafty.19.3.use from Pingo Penguin on Vimeo.

দাবা খেলার প্রোগ্রাম কে সংক্ষেপে চেস ইঞ্জিন বলে। চেস ইঞ্জিন চালাতে দুটো জিনিস লাগে, একটা graphical user interface (GUI) ও একটা প্রোগ্রাম কোড (engine)। আমি এখানে যেটা নিয়ে কথা বলছি তার GUI এর নাম winboard, আর এঞ্জিন হিসাবে crafty বা fruit  বা অন্য কোন কিছু থাকতে পারে। এটা একটা ফ্রী প্রোগ্রাম, তবে খুব সহজে প্রোগ্রাম টা ব্যবহারের জন্য executable ফাইল খুব সহজে ইন্টারনেটে পাওয়া যায় না। গুগল করে দেখতে পারেন, সাধারনত GUI ও প্রোগ্রাম আলাদা ভাবে পাবেন, এবং দুটোকে একসাথে জুড়ে কাজে লাগানোর জন্য প্রোগ্রামিং এর জ্ঞ্যান ও ধৈর্য দরকার, কারন এই প্রোগ্রাম এর ডেভেলোপার রা অনেক সময়েই ট্রায়াল ভারসন বাজারে ছেড়ে দ্যান। আপনার উৎসাহ থাকলে ইন্টারনেট ঘেঁটে পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

অথবা এত কিছু করতে না চাইলে বিকল্প হিসাবে আমার দেওয়া লিঙ্ক ব্যবহার করতে পারেন। অনেকদিন খোঁজার পর এটা আমি পেয়েছিলাম। এটা লেটেস্ট ভার্সন নয়, তবে এটার সুবিধা হলো এটা স্টেবল প্রোগ্রাম, এবং একটা executable file  চালালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, আর কিছু করতে হয় না। আমার দেওয়া লিঙ্ক টা winboard 4.2.7 with crafty19.3. এর পরে অনেক ভার্সন বেরিয়েছে, তবে স্টেইবল ভার্সন পেতে একটু সমস্যা হয়।

প্রোগ্রাম টা কিভাবে ব্যবহা করবেন তার সোজা পদ্ধতি নিচে জানিয়ে দিচ্ছিঃ

১/ প্রোগ্রাম টি ডাউনলোড করুন।

২/ rar ফরমাট থেকে একস্ট্রাক্ট করুন, executable ফাইল পেয়ে যাবেন।

৩/ আপনার কম্পুটারে প্রোগ্রামটি চালান, সব কিছু ইনস্টল হয়ে যাবে।

৪/ প্রোগ্রামটির ব্যবহার শিখতে ভিডিও দেখুন।

৫/ কোনো সমস্যা হলে জানান, সমাধানের চেষ্টা করবো।

এখনো পর্যন্ত যেসব কিস্তিমাত শিখেছেন সেসব অভ্যাসের জন্য প্রোগ্রামটি ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া ইঞ্জিন এর সাথে খেলতে চাইলেও এই প্রোগ্রাম টি ভালো, তবে সমস্যা হলো প্রোগ্রামটি যে কোনো শখের খেলোয়াড়ের জন্য প্রচন্ড শক্তিশালী (~২৫০০ এলো রেটিং বা একজন সাধারণ গ্রান্ডমাস্টার এর মতো) খেলা অভ্যাস করতে চাইলে ঊইন্ডোস ৭ এর প্রোগ্রাম এর সাথে আপনার রেটিং লেভেলে খেলতে পারেন। তবে কম্পুটারের সাথে খেলে খেলায় উন্নতি করা খুব কঠিন। উন্নতির জন্য অন্য কোনো খেলোয়াড়ের সাথে খেলার কোন বিকল্প নেই।

আজ এই পর্যন্তই। এতদিনে আমরা খেলার জন্য তৈরী হয়েছি। এর পরের লেকচারে আমরা পুরো খেলা পরিচালনা করা নিয়ে কথা বলবো।

chess101-lecture08

একটি খেলার তিনটি অংশঃ

একটা দাবা খেলার তিনটি অংশ। প্রারম্ভিক ভাগ, মধ্যভাগ ও অন্তিম ভাগ বা opening, middlegame and endgame। এই তিনটি ভাগের প্রত্যেকটির খেলা পরিচালনার কৌশল অন্যটার থেকে অনেক আলাদা। তাই একটা পুরো খেলা পরিচালনা শেখার জন্য আমরা তিনটি ভাগ কে আলাদা করে শিখবো। আমার পরের বেশ কয়েকটি লেকচারে পরপর প্রত্যেকটা ভাগ নিয়ে আলোচনা করবো।

অবশ্য সমস্ত খেলাতেই তিনটি অংশ থাকে না। যেমন নিচের খেলা টা ধরা যাকঃ

1.f4 e5 2.g4 Qh5#

দুই চালেই খেলা খতম। এই খেলার কোনো মধ্যভাগ বা অন্তিম ভাগ নেই তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয়। এমনকি প্রারম্ভিক ভাগ ও প্রায় নেই। অথবা, নিচের খেলা টি ধরা যাক

1.e4 e5 2.Bc4 Nc6 3.Qh5 Nf6 4.Qxf7#

মাত্র চার চালেই কালোর রাজা কিস্তিমাত হয়েছে। এক্ষেত্রে খেলা টা আগের থেকে একটু লম্বা, তবে এই খেলারও কোনো মধ্যভাগ বা অন্তিম ভাগ নেই।

সুতরাং, একজন খেলোয়াড় ভালো খেলতে না পারলে খুব সহজেই একদম শুরুতে খেলা শেষ হয়ে যেতে পারে। তবে দুজন খেলোয়াড় ভালো খেললে সাধারণত অনেক লম্বা খেলা হয়। এরকম খেলায় অনেক চাল থাকে, এবং তিনটি বিভাগ ই থাকে। যে সমস্ত খেলায় তিনটি ভাগই আছে আমরা এখানে সেরকম খেলার কথা বলছি। এই তিনটি ভাগের কি কি প্রধান পার্থক্য আমরা এখানে তা নিয়ে আলোচনা করবো। খেলা ভালোভাবে পরিচালনা করতে গেলে তিনটি ভাগ ই ভালোভাবে পরিচালনা করতে শিখতে হবে। নীচে প্রত্যেকটা বিভাগ সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো।

প্রারম্ভিক ভাগ (Opening):

খেলার প্রারম্ভিক ভাগে প্রত্যেকে নিজের শক্তি বাইরে নিয়ে আসে ও পরবর্তী ভাগের খেলার জন্য তৈরী হয়।

ওপেনিং এর প্রধান উদ্দেশ্য হলোঃ

  1. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমস্ত ঘুটি কে একসাথে বাইরে ভালো জায়গায় এনে ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া।
  2. বোর্ডের কেন্দ্রর উপর নিজের দখল প্রতিষ্ঠা করা।
  3. কাসলিং এর মাধ্যমে রাজা কে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া।

রাজা কে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বহুল ব্যবহৃত একটা পদ্ধতি হলো কাসলিং বা দুর্গ প্রতিষ্ঠা। সমস্ত ঘুটি বাইরে আনা ও রাজার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পর দুই নৌকার মধ্যে সরাসরি সংযোগস্থাপন সম্পন্ন হলে ওপেনিং সমাপ্ত হয়েছে বলা চলে। খেলা কেমন ভাবে চলছে তার উপর নির্ভর করে ওপেনিং সাধারণত ৭-১৫ চাল অবধি চলে।

প্রত্যেকটা খেলার শুরুর অবস্থান একই, তাই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হলে ওপেনিং এ আপনি আপনার খেলার পুরনো জ্ঞ্যান কিছুটা কাজে লাগিয়ে পরিচালনা করতে পারবেন। দুই পক্ষের পছন্দের চাল এর উপর ভিত্তি করে অনেক রকম  ভাবে ওপেনিং খেলা হওয়া সম্ভব। এরকম দুটো খুব জনপ্রিয় ওপেনিং এর নাম হলো কুইন্স গামবিট ডিক্লাইন্ড ও রুই লোপেজ বা স্প্যানিশ ওপেনিং। এই দুটো ওপেনিং বহুদিনের পুরনো, কয়েক শতাব্দী ধরে খেলা হয়ে আসছে। এখনও গ্রান্ডমাস্টার দের মধ্যে বহুল ব্যবহার দেখা যায়। তবে এছাড়াও আরও অনেক বহুল প্রচলিত ওপেনিং আছে। সবার নাম মনে রাখা প্রায় অসম্ভব, দরকার ও নেই।

মধ্যভাগ (middlegame):

খেলার প্রারম্ভিক ভাগ শেষ হবার পর মধ্যভাগ শুরু হয়। খেলার মধ্যভাগে সাধারণত দুজনের ই সমস্ত শক্তির বিকাশ সম্পুর্ণ হয়েছে, এবং অপেনিং কেমন ভাবে খেলা হয়েছে তার উপর নির্ভর করে মধ্যভাগ কোনো একটা পজিশনে পৌছবে। মধ্যভাগে বোর্ডে প্রচুর ঘুটি থাকে, আর দুপক্ষের ই নানান রকমের চাল দেওয়ার সম্ভবনা থাকে।  খেলার মধ্যভাগ খুব জটিল, কারন প্রত্যেকটি খেলায় আপনি একটা সম্পুর্ণ নতুন অবস্থানে পৌছবেন, এবং সেই নতুন পজিশন অনুযায়ী আপনাকে বুঝে খেলা পরিচালনা করতে হবে।

খেলার মধ্যভাগের প্রধান লক্ষ্য হলো

  1. পজিশন অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক খেলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আক্রমণ রক্ষণ ইত্যাদি ব্যাপারে নজর রাখা।
  2. সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের ঘুটি জিতে নেওয়া বা সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের রাজাকে কিস্তিমাত করা।
  3. নিজের রাজাকে কিস্তিমাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিরাপদ জায়গায় রাখা খুব জরুরি।

মধ্যভাগের কিছু সাধারণ কৌশল জানা থাকলে খেলার মধ্যভাগ পরিচালনা করার সময় সেসব কৌশল আপনাকে সাহায্য করবে। কি ভাবে পরিকল্পনা করা সম্ভব, বা কিভাবে প্রতিপক্ষের ঘুটি জিতে নেওয়া সম্ভব তা আমরা পরে শিখবো। তবে ওপেনিং এর মতো চেনা পজিশন পাবেন না, প্রত্যেকটি পজশন আলাদা, তাই আপনার নিজের বিচার-বিবেচনা এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাধান্য পাবে। খেলা কেমনভাবে চলছে তার উপর নির্ভর করে খেলার ৭-১৫ চাল থেকে শুরু করে ৩০-৫০ চাল অবধি খেলার মধ্যভাগ চলতে পারে।

অন্তিমভাগ (endgame):

খেলার মধ্যভাগ শেষ হলে অন্তিম ভাগ শুরু হয়। খেলার অন্তিমভাগের প্রধান বৈশিষ্ট হলো দুই পক্ষের ই বেশিরভাগ ঘুটি খাওয়া যাবার পর মাত্র একটা বা দুটো ঘুটি অবশিষ্ট থাকে, কিছু বোড়ে অবশিষ্ট থাকে, এবং সাধারণত বোর্ডে মন্ত্রী থাকে না – এর ফলে বিপক্ষের রাজাকে সরাসরি কিস্তিমাত সাধারণত সম্ভব নয়। তাই বোড়ে কে শেষ ঘর অবধি নিয়ে গিয়ে মন্ত্রী তুলতে পারলে খেলায় জেতার সম্ভবনা প্রবল হয়। আর যেহেতু বোর্ডে বেশি ঘুটি থাকে না, তাই কিস্তিমাতের সম্ভাবনা কম, তাই রাজা বোর্ডের কোনার নিরাপদ অবস্থান থেকে বোর্ডের একদম মাঝখানে এসে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যার রাজা তাড়াতাড়ি মাঝে আসতে পারে সাধারণত তার জেতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সুতরাং খেলার অন্তিম ভাগের প্রধান লক্ষ্য হলোঃ

  1. নিজের ঘুটি কে সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়া।
  2. রাজাকে যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝে নিয়ে আসা।
  3. নিজের বোড়ে বোর্ডের শেষপ্রান্তে নিয়ে গিয়ে মন্ত্রী তোলা এবং প্রতিপক্ষ যাতে মন্ত্রী না তুলতে পারে সেদিকে নজর রাখা।

খেলার মধ্যভাগ সমাপ্ত হবার পর থেকে শুরু করে একদম শেষ চাল অবধি এন্ডগেম বা অন্তিম ভাগের খেলা চলে।

খেলার তিনটি ভাগ সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণার জন্য এখন এটুকু মনে রাখলেই চলবে। এরপর কয়েকটা লেকচার ধরে আমরা প্রত্যেকটি বিভাগ নিয়ে বিশদে আলোচনা করবো।

লেখার বাকি অংশটায় খেলা শেখার বিশেষ কিছু নেই, তবে গল্পের মতো পড়তে পারেন।

দাবার ঘড়ি chess clock

প্রতিযোগীতামূলক দাবা খেলার সময় খেলোয়াড়দের খেলা শেষ করার জন্য একটা সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়। সময়সীমা কতক্ষণ হবে তা আগে থেকে ঠিক করা হয়। সময়ের প্রতি নজর রাখার জন্য খেলায় একটা বিশেষ রকমের ঘড়ি ব্যবহার করা হয়, যাতে দুটো ঘড়ি একসাথে থাকে। একটা ঘড়ি সাদার জন্য, অন্যটা কালোর জন্য। সাদার চালের সময় সাদার ঘড়ি চলে, কালোর ঘড়ি বন্ধ থাকে। সাদা চাল সমাপ্ত করার পর একটা বোতাম চাপে। এর ফলে সাদার ঘড়ি বন্ধ হয়ে যায় এবং কালোর ঘড়ি শুরু হয়। কালো চাল দেবার পর আবার অন্য একটা বোতাম চাপে, এতে কালোর ঘড়ি বন্ধ হয় ও সাদার ঘড়ি চলতে শুরু করে। এরকম করে চলতে চলতে খেলা শেষ হবার আগে যদি কারো সময় ফুরিয়ে যায় তবে সে হেরে যায়।

সময়সীমা অনুযায়ী খেলার প্রকারভেদ

খেলার ধরণ অনুযায়ী খেলার সময়সীমা অনেক রকমের হতে পারে। যেমনঃ

  • ক্লাসিক্যাল দাবা (classical chess):

টুর্নামেন্টের  লম্বা খেলা গুলো সাধারণত এই নিয়ম মেনে খেলা হয়। কোন টুর্নামেন্টের খেলার সময় দেখলে হয়তো এরকম দেখতে হবেঃ

2 hr for first 40 moves + 1 hr for next 20 moves + 3o min/player — 30 second increment from move 1/61.

এর মানে হলো যেকোনো একজন খেলোয়াড় প্রথম ৪০ টা চালের জন্য ২ ঘন্টা পাবে। একজন খেলোয়াড় একটা চালের পিছনে ১ ঘন্টা ৫৯ মিনিট সময় ব্যয় করলে বাকি ১ মিনিটের মধ্যে বাকি ৩৯ টা চাল শেষ করতে হবে, নয়তো সময়ের জন্য হেরে যাবে। দুজন খেলোয়াড় ই প্রায় পুরো সময় ব্যয় করলে প্রথম ৪০ টা চাল সমাপ্ত হতে ২+২ বা ৪ ঘন্টা মতো সময় লাগে। কোন খেলোয়াড় ৪০ টা চাল দেবার পর তার ঘড়িতে পরের ২০ টা চালের জন্য ১ ঘন্টা যোগ করা হয়। ৪০+২০ বা ৬০ চালের পর প্রত্যেক খেলোয়াড় এর ঘড়িতে আরো ৩০ মিনিট যোগ করা হয়। একটা লম্বা খেলা অনেক সময় ধরে চললে ৭-৮ ঘন্টা ধরে চলতে পারে। 30 second increment এর মানে হলো প্রত্যেক চাল এর পর আপনার ঘড়িতে ৩০ সেকেন্ড যোগ করা হবে। টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম চাল বা ৬১ তম চাল থেকে বাড়তি সময় যোগ করা হয়।

দুর্ভাগ্যবশত প্রত্যেকটা টুর্নামেন্টের সময়সীমা অন্যটার থেকে একটু আলাদা হয়, একদম বাঁধাধরা কোন সময়সীমা নেই। কোথাও কোথাও প্রথম ৪০ চাল এর জন্য দু ঘন্টার বদলে দেড় ঘন্টা দেওয়া হয়। এর ফলে খেলোয়ারডের বেশ সমস্যা হয়। একটা সিরিজে ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ ৪ দিনের, পরের সিরিজে ৫ দিনের, তার পরের সিরিজে ৩ দিনের হলে খেলোয়াড় দের কি রকম সমস্যা হতো ভাবুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন।

  • র‍্যাপিড দাবা (rapid chess):

কোন নির্দিষ্ট বাধাধরা সময়সীমা নেই, তবে একজন খেলোয়াড়ের পুরো খেলার জন্য বরাদ্দ সময় ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যে হলে সেই খেলা কে র‍্যাপিড দাবা বলা হয়। র‍্যাপিড দাবার একটা খেলা ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা মতো চলতে পারে। এখনকার খুব জনপ্রিয় র‍্যাপিড দাবার জন্য ব্যবহৃত সময় হলো ২৫ মিনিট + ১০ সেকেন্ড। প্রথম ভাগ টা খেলার জন্য বরাদ্দ মোট সময়, দ্বিতীয় ভাগ টা বোঝাচ্ছে প্রত্যেক চালের পর ঘড়িতে ১০ সেকেন্ড যোগ হবে।

  • Blitz chess

একজন খেলোয়াড়ের পুরো খেলার সময়সীমা ৫ মিনিটের বেশি কিন্তু ১০ মিনিটের কম হলে সাধারণত এই ক্যাটেগরি তে পড়ে। ইন্টারনেটে সবচেয়ে জনপ্রিয় সময় হলো ৫ মিনিট + ০ সেকেন্ড। খেলায় প্রত্যেক চালের শেষে বাড়তি সময় না থাকার জন্য সাধারণত শেষের দিকে ১০-২০ সেকেন্ড বাকি থাকা অবস্থায় আসল খেলার বদলে কে কত তাড়াতাড়ি মাউস চালাতে পারে তার প্রতিযোগীতা চলে। এই প্রতিযোগীতা বেশ মজার, তবে এই ধরনের খেলাকে সাধারণত সিরিয়াসলি নেওয়ার কোন কারন নেই। যারা এরকম মাউস প্রতিযোগীতায় যেতে চান না তারা সাধারণত ৫ মিনিট + ১/২ সেকেন্ড বা ৩ মিনিট + ১/২ সেকেন্ড সময় নিয়ে খেলেন। ৩ মিনিট + ২ সেকেন্ড সময়সীমা ও খুব জনপ্রিয়।

  • Bullet chess

একটা পুরো খেলার সময়সীমা সাধারণত ১ থেকে ২ মিনিট। খুব জনপ্রিয় বুলেট সময়সীমা হলো ১মিনিট+০সেকেন্ড। অর্থাৎ পুরো খেলাটা ১ মিনিটে শেষ করতে হবে, কোন বাড়তি সময় নেই। এই ফরম্যাটে দাবা কম, মাউস রেস অনেক বেশি। বুঝতে পারছেন আপনি খুব তাড়াতাড়ি চাল দিতে পারলে একটা সময়ের পর আপনার প্রতিপক্ষের সময় ফুরিয়ে যাবে, ফলে আপনি জিতে যাবেন। তবে টাইটেলধারী খেলোয়াড়রা ১ মিনিটের খেলায় ও বেশ ভালো খেলতে পারেন। সাধারণত মজার জন্য, বা কোন একটা বহুচর্চিত ওপেনিং বারবার অভ্যাসের জন্য বুলেট গেম খেলে থাকেন। এরকম ফরম্যাটে এক ঘন্টায় একজন খেলোয়াড় ২৫-৩০ টা গেম শেষ করতে পারেন।

  • Correspondence chess or Postal chess

এই ফরম্যাট বুলেট চেস এর একদম উলটো। এরকম নামের কারন হলো বহুদিন আগে বা প্রাচীনকালে (!!) চিঠির মাধ্যমে দাবা খেলা হতো। এখন ইন্টারনেটের যুগে সেসবের খুব একটা দরকার নেই। এই ফরম্যাটে একজন খেলোয়াড়ের প্রত্যেক চালের জন্য সাধারণত কয়েকদিন সময় দেওয়া হয়। একটা খুব জনপ্রিয় সময়সীমা হল ৩ দিন/চাল। এছাড়া ৫ বা ৭ দিন/চাল ও জনপ্রিয়। আমি সাধারণত ৫ দিন/চাল ফরম্যাটে খেলি। এতে দু একদিন চাল দিতে ভুলে গেলে সময়ের জন্য হেরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচা যায়।

কর্মজীবনে ব্যস্ততার জন্য বা অন্য কারনে যাদের বোর্ডে বসে ৫-৭ ঘন্টা ধরে লম্বা গেম খেলার সময় নেই ( আমার নেই) তাদের জন্য এই সময়সীমা ভালো। আপনি যখন সময় পাবেন তখন নিজের পছন্দমতো চাল দিয়ে রাখবেন। তারপর আপনার প্রতিপক্ষ আবার তার সময়মতো চাল দিয়ে রাখবে। এতে একটা খেলা অনেকদিন চলে, তবে একসাথে আপনি অনেকগুলো খেলা খেলতে পারেন।

অন্য ফরম্যাটের সাথে এই ফরম্যাটের প্রধান পার্থক্য হলো আপনি খেলা সংক্রান্ত যত খুশি বইপত্র/লেখা/ডাটাবেস সব কিছু ব্যবহার করতে পারেন। এবং সেরা চাল কোনটা তা বোঝার জন্য বোর্ডের ঘুটি নেড়েচেড়ে দেখতে পারেন, তবে দাবা ইঞ্জিন ব্যবহার করা চলবে না।

  • Advanced chess

নিয়ম আগের (করেসপন্ডেন্স চেস) মতোই, তবে এক্ষেত্রে দাবা ইঞ্জিন ব্যবহার করা যাবে। খেলার পথে আমাদের এতদিনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা/জ্ঞান ও মানুষের দূরদৃষ্টি ও কম্পুটার এর গণনা করার শক্তি যোগ করা হয়। এই ফর্মাটে কোন পজিশনে  সাধারণত absolute best চাল খোঁজার চেষ্টা করা হয়, বা পজিশনের chess truth খোঁজার চেষ্টা করা হয়। সৌভাগ্যবশত এখনও অবধি কেও খেলার একদম শুরু থেকে দাবা কে solve করে ফেলতে পারেনি। দাবা খেলার সমাধান হয়ে গেলে উত্তরটা হয়তো এরকম হবে…1.e4 wins. মানে এই চালের পর যে চাল ই দেওয়া হোক না কেনো, দু পক্ষের সেরা চাল এর পর প্রথম খেলোয়াড় এর জয় নিশ্চিত। এরকম এখনো হয়নি, বা আগামী ৫০ বছরে হবার সম্ভাবনা খুব কম।

  • chess960 বা ফিশার র‍্যান্ডম চেসঃ

স্টান্ডার্ড দাবা খেলায় একজন খেলোয়াড় ওপেনিং চাল এর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন। এই প্রস্তুতি কতদূর হবে সেটা নির্ভর করছে আপনি কোন লেভেলে খেলছেন তার উপর। একজন বিগিনার ১-২ চাল এর পরেই নিজে ভাবতে শুরু করে, আর একজন পেশাদার খেলোয়াড় খেলার ধরণ এর উপর নির্ভর করে ১০-১৫ বা ২০-২৫ টা চাল আগের প্রস্তুতি থেকে খেলে দিতে পারেন। একদম আধুনিক খেলায় শুরুর দিকটা প্রস্তুতির যুদ্ধ হয়, তারপর একটা সময় পর দক্ষতার যুদ্ধ শুরু হয়।

আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে অবধি সেরা খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি বাকিদের থেকে অনেক ভালো হতো, কারন একদম সেরা খেলোয়াড়রা বাকিদের চেয়ে অনেক ভালো প্রস্তুতি নিতে পারতেন। কিন্তু আজকের যুগে কম্পুটার খুব শক্তিশালী হয়ে যাবার পর সবার প্রস্তুতি ই খুব ভালো, তাই একজন দাবা খেলা ভালো বুঝলেও প্রস্তুতিতে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ কম, কারন অন্যজন কম্পুটার এর সাহাজ্যে খেলার দখল এর ঘাটতি অনেকটা পূরণ করতে পারেন। আগের যুগে কম্পুটার খুব শক্তিশালী না হওয়ার জন্য একজন সাধারণ খেলোয়াড়ের পক্ষে একজন সেরা খেলোয়াড়ের মতো প্রস্তুতি সম্ভব ছিল না।

যাইহোক, প্রত্যেকটা খেলা একই পজিশন থেকে শুরু করার একটা বড়ো সমস্যা রয়েছে। সেটা হলো, শুরুর দিকে একদম দক্ষতার লড়াই হওয়া বেশ কঠিন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। এর ফলে দাবার মতো অনেক খেলার (chess variants) জন্ম হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো chess960 or Fischer random chess.

chess960 খেলার নিয়ম সাধারণ দাবার মতোই, তবে খেলার শুরুতে খেলার আগের মূহুর্তে লটারির মাধ্যমে প্রথম ও অষ্টম সারির সমস্ত ঘুটি র‍্যান্ডম বসিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাসলিং এর জন্য একটু আধটু বিশেষ নিয়ম প্রয়োগ করা হয়, তাছাড়া বাকি সব নিয়ম একই রকম। এর ফলে প্রস্তুতির কোন ঝামেলা নেই, একদম প্রথম চাল থেকে ভাবনা বাধ্যতামূলক। কয়েকটা চালের পর মধ্যভাগে গিয়ে সাধারণ দাবার মতো করে খেলা পরিচালনা করা যায়।

এই খেলার আবিষ্কর্তা ফিশার, তাই খেলার এরকম নাম। খেলার নিয়ম মেনে ঘুটি shuffle এর ফলে মোট ৯৬০ টা ওপেনিং পজিশন সম্ভব, তাই এরকম নাম। এই ৯৬০ টা পজিশনের মধ্যে একটা পজিশন হলো স্টান্ডার্ড দাবার শুরুর পজিশন।

অনেক পেশাদার খেলোয়াড় ই প্রস্তুতির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আরও বেশি করে chess960 টুর্নামেন্ট খেলতে চান, কিন্তু এখনও অবধি এই ফর্মাট খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি। তবে আমার মতে chess960 হলো দাবার ভবিষ্যত। chess960 আমার খুব প্রিয়।

ইন্টারনেটে দাবা চর্চার ভালো জায়গাঃ

এই লেকচার টা খুব ছোটো, তাই অনলাইনে দাবা খেলা/পড়া/শেখা/চর্চা করার কিছু ভালো জায়গার নাম এখানে দিচ্ছি। কেউ অনলাইনে দাবা সংক্রান্ত কিছু খুঁজলে এই লিস্টে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন, কাজের কিছু পাবেন আশা করি। লিস্ট টা বানাচ্ছি আমার এতদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, শুধুমাত্র আমার জানা জিনিসপত্রের উল্লেখ করছি, তাই অনেক কিছু হয়তো বাদ রয়ে যাবে। বিনামূল্যে যেসব রিসোর্স পাওয়া যায় সেগুলোর উপর জোর দেবো।

  • দাবা খেলার ভালো ওয়েবসাইট

  1. chess.com – একদম ফ্রী। সব রকম খেলোয়াড়দের জন্য ভালো।
  2. chesscube.com – ফ্রী। আমার জানা একমাত্র ওয়েবসাইট যেখানে chess960 খেলা যায়।
  3. gameknot.com – ফ্রী। করেসপন্ডেন্স দাবার জন্য খুব ভালো।
  4. playchess.com – ফ্রী, তবে প্রোগ্রাম ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে হয়।
  5. Internet Chess Club (ICC) – খেলতে গেলে মেম্বারশিপ এর পয়সা লাগে। বেশিরভাগ টাইটেলধারী খেলোয়াড়রা প্রধানত এখানে খেলেন।
  • দাবা খেলার ডাটাবেস

  1. chessgames.com – এখানে খেলা যায় না, তবে খেলা চর্চার জন্য খুব ভালো জায়গা। প্রত্যেকটা খেলার নিচে বিশ্লেষণ, আলোচনা ইত্যাদির জন্য জায়গা আছে। বেশিরভাগ জিনিসপত্র বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এখানে একদম উচু লেভেল খেলোয়াড়দের খেলার ডাটাবেস আছে, তবে পুরো ডাটাবেস দেখতে গেলে মেম্বারশিপ লাগে।
  2. 365chess.com – বিনামূল্যে ডাটাবেস দেখার সবচেয়ে ভালো জায়গা. তবে সাধারণ মানের খেলোয়াড় এর খেলায় ডাটাবেস ভর্তি, তাই ডাটাবেস দেখার সময় রেটিং ফিল্টার করতে ভুলবেন না।
  3. chessbase.com – এরা ডাটাবেস এর জন্য বিশ্ববিখ্যাত। সব বড়ো খেলোয়ার এদের ডাটাবেস ব্যবহার করে। কিছুদিন আগে অবধি এদের ডাটাবেস এর কিছু অংশ বিনামূল্যে ব্যবহার করা যেত, এখন সম্ভবত আর করা যায় না।
  • দাবা খেলার খবর

  1. chessbase.com – দাবার খবরের ব্যাপারে এরাই শেষ কথা।
  2. chessvibes.com – বেশ ভালো।
  • দাবা শেখার জন্য ওয়েবসাইট

  1. chess.com – নতুন বা পাকা সমস্ত রকমের খেলোয়াড়দের জন্য এখন সবচেয়ে ভালো জায়গা
  2. chessville.com – এদের বিগিনার সিরিজ টা নতুন খেলোয়াড় দের জন্য বেশ ভালো।
  3. chesscafe.com – এখানে প্রত্যেক মাসে দাবা সংক্রান্ত আর্টিকেল ছাপা হয়। বিষয় বিবিধ। অনেক লেখক আছেন। আর্কাইভে গেলে সমস্ত আর্টিকেল দেখতে পাবেন।
  4. chesspub.com – ভালো টুর্নামেন্ট খেলোয়াড় (অন্তত ১৫০০-১৬০০ রেটিং ) ছাড়া বাকিদের জন্য খুব কঠিন জায়গা। যারা ওপেনিং সম্বন্ধে বেশ ভালো জানেন কিন্তু কোন একটা নির্দিষ্ট ওপেনিং এর একটা বিশেষ প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন না  তারা এখানে চেষ্টা করতে পারেন।

আপাতত এটুকুই, এখন আর কিছু মাথায় এলো না। পরে মনে পড়লে যোগ করে দেবো। কেউ এই লিস্টে নতুন রিসোর্স যোগ করতে চাইলে নিচে মন্তব্যের জায়গায় লিখুন। বাকিদের কাজে লাগবে।

লেখাটি কেমন লাগলো জানাবেন। পরের লেকচারে খেলার প্রারম্ভিক ভাগ (ওপেনিং) এর নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা করবো।

chess101-lecture06

লেখার শুরুতে আমরা একটা খুব সহজ কিস্তিমাতের পদ্ধতি শিখবো। শক্তিশালী পক্ষের যদি একটা মন্ত্রী এবং একটা নৌকা অবশিষ্ট থাকে তবে রাজার সাহাজ্য ছাড়াই খুব সহজে কিস্তিমাত করা যায়।

উপরের ছবিতে মন্ত্রী এবং নৌকা মিলে খুব সহজে বিপক্ষের রাজা কে কিস্তিমাত করতে পারে। কালো রাজার যেকোনো নিয়মমাফিক চালের জন্য তীর অনুযায়ী 1.Re4, 2.Qd3, 3.Rc4, 4.Qb3, 5. Ra4 ইত্যাদি চাল গুলো পরপর খেললে কিস্তিমাত হবে। এখানে কালো রাজার কিছুই করার নেই কারন সাদার মন্ত্রী এবং নৌকা একে অপরকে রক্ষা করছে, এবং কালো রাজা কে আসতে আসতে বোর্ডের একপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরনের কিস্তিমাত এর পদ্ধতিকে সংক্ষেপে step-ladder [সিড়ি ভাঙ্গা?] বলে।

সিড়িভাঙ্গা পদ্ধতির দুটো ধাপঃ

১/ রাজা কে দূরে সরিয়ে নিন, যাতে মন্ত্রী ও নৌকা বিপক্ষের রাজা কে সরাসরি দেখতে পায়।

এবং

২/ মন্ত্রী ও নৌকা পাশাপাশি এনে সিড়িভাঙ্গা পদ্ধতিতে চাল দিন।

মন্ত্রী ও নৌকার বদলে দুটো মন্ত্রী দিয়েও step-ladder পদ্ধতিতে খুব সহজে কিস্তিমাত সম্ভব। দুটো নৌকা দিয়ে কিস্তিমাত করার চেষ্টা করলে কি হবে সেটা নিজে চেষ্টা করে দেখুন।

দুই গজ-এর দ্বারা কিস্তিমাতঃ

দুই গজ দিয়ে কিস্তিমাত করা আগের কিস্তিমাত গুলোর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। গজ এর প্রধান সমস্যা হলো, একটা গজ দিয়ে কেবলমাত্র এক রকম রঙের ঘর নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাই বোর্ডের সমস্ত ঘর নিয়ন্ত্রণ করতে দুটো গজ কে একসাথে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা দরকার।

দুই গজ দিয়ে কিস্তিমাত অনেকভাবে করা সম্ভব। অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করে এর চেয়ে কম চালে কিস্তিমাত সম্বব, তবে ব্যখ্যা করার সুবিধার্থে আমি একটা সোজা পদ্ধতি শেখাচ্ছি। যেকোন পদ্ধতি ব্যবহার করে কিস্তিমাত করতে পারলেই হবে। তবে জানা না থাকলে দুজ গজ ও রাজা নিয়ে এদিক ওদিক করতে থাকলে একটা সময় পর পঞ্চাশ চাল পর নিয়ম অনুযায়ী খেলা ড্র হবে। তাই কিস্তিমাত শিখে রাখা ভালো।

ভালোভাবে শিখতে ভিডিও দেখুন। নিচে কিস্তিমাত পদ্ধতির একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিচ্ছি।

বোর্ডের মাঝে কালো রাজা এবং প্রান্তের দিকে দুই সাদা গজ ও সাদা রাজা আছে।

lecture6.1.1

প্রথম ধাপে দুই গজ দিয়ে আমরা বোর্ডের চারটে কেন্দ্রের ঘর নিয়ন্ত্রণ করবো।

lecture6.1.3

দ্বিতীয় ধাপে দুই গজ দিয়ে কেন্দ্র দখল করে রাজাকে একটা ছোটো বাক্সের মধ্যে বন্দি করবো।

lecture6.1.4

তৃতীয় ধাপে রাজা কে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসবো।

lecture6.1.5

চতুর্থ ধাপে দুই গজ ও রাজার সহায়তায় কালো রাজার চলাফেরার জায়গা ছোটো করবো। তীর বরাবর দুই গজ কে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবো। এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবো যাতে এগোনোর সময় কালো রাজা সাদা গজ কে আক্রমণ করতে না পারে।

lecture6.1.6

তারপর আবার রাজা কে আগের প্যাটার্ণ অনুযায়ী নতুন করে সঠিক পজিশনে নিয়ে আসবো।

lecture6.1.7lecture6.1.8

তারপর আবার আগের পদ্ধতি অনুসরণ করে কালো রাজাকে আরো কোনায় নিয়ে যাবো।

lecture6.1.9

তারপর তীর বরাবর সাদা রাজাকে নতুন ঘরে নিয়ে আসবো। এতক্ষণে একদম প্রান্তের তিনটি ঘরে চলাফেরা করা ছাড়া কালো রাজার আর কিছু করার নেই। সাদা রাজার ভ্রমণ সম্পুর্ণ হলে এরকম পজিশন হবেঃ

lecture6.1.10

এরপর সাদা গজ এর দ্বারা কালো রাজার কাছ থেকে সবুজ ঘরটি দখল মুক্ত করবো। তাহলে এরকম পজিশন হবে।

lecture6.2.2

স্টেলমেট আলার্টঃ

আমরা একদম শেষ ধাপে এসে পৌছেছি। এবার সাদার চাল। কালো রাজার মাত্র দুটো ঘর আছে, কালো গজ দিয়ে একটা ঘর কেড়ে নিলে স্টেলমেট হয়ে যাবে।

lecture6.2.3

this is stalemate..avoid stalemate.

স্টেলমেট হলে ড্র হবে। এত খাটনির পর স্টেলমেটের মাধ্যমে খেলা ড্র করা বেশ বেদনাদায়ক, সুতরাং সতর্ক থাকুন।

আমরা ড্র চাই না, তাই কালো গজ দিয়ে একটা চাল নষ্ট করবো।

lecture6.2.5

correct move! no stalemate!

তারপর পরের চালে কিস্তিসমেত কালো রাজাকে কোনায় ঠেলে দেবো। পরের চালে সাদা গজ দিয়ে কোনায় কিস্তিমাত।

lecture6.2.6lecture6.2.7

কিস্তিমাত সমাপ্ত।

সম্ভাব্য চাল এরকম হতে পারেঃ

[FEN “8/8/8/4k3/8/8/8/2B2B1K w – – 0 1”]
[SetUp “1”]

lecture6.1.1

1. Bb2+ Kd5 2. Bg2+ Kd6 3. Bd4 Ke6 4. Be4 Kd6 5. Kg2 Ke6 6. Kf3 Kd6 7. Kf4
Ke6 8. Kg5 Kd6 9. Kf5 Kd7 10. Bc5 Kc7 11. Bd5 Kd7 12. Ke5 Kc7 13. Ke6 Kc8
14. Bb6 Kb8 15. Bc6 Kc8 16. Kd5 Kb8 17. Kc4 Kc8 18. Kb5 Kb8 19. Ka6 Kc8 20.
Bc5 Kb8 21. Bd7 Ka8 22. Bd4 Kb8 23. Be5+ Ka8 24. Bc6#
{White mates} 1-0

আমরা সহজ কিস্তিমাত শেখা এখানেই শেষ করলাম। সমস্ত কিস্তিমাতের পদ্ধতি ভালোভাবে আয়ত্ত করতে বেশ কয়েকবার প্রাকটিস দরকার। একটা বোর্ড নিয়ে কোনো বন্ধুর সাথে, বা নিজে দুই দিক খেলে, বা কোনো কম্পুটার প্রোগ্রাম এর সাথে প্রাকটিস করতে পারেন। খেলা প্রাকটিস এর জন্য দাবা ইঞ্জিন কিভাবে ব্যবহার করবেন তা পরের লেকচারে শেখাবো। তার সাথে বিভিন্ন দাবা ঘুটির তুলনামূলক মূল্য ও শিখবো।

আজ এখানেই শেষ করছি। লেখাটি কেমন লাগলো জানাবেন। কোনো প্রশ্ন বা অন্য কিছু বলার থাকলে নিচে মন্তব্য করুন।